কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিশ্বব্যাপী চাহিদা বৃদ্ধির কারণে চিপ ব্যবসায় বিপুল মুনাফা অর্জন করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। তবে মুনাফায় বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও ভবিষ্যতে মেমোরি চিপের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে তুলনামূলক সতর্ক পূর্বাভাস এবং শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নতুন আর্থিক সুবিধার ঘোষণা না আসায় কোম্পানিটির শেয়ারদরে পতন দেখা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের পরিচালন মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি চিপের চাহিদা বৃদ্ধি এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, এআই সার্ভার এবং উন্নত কম্পিউটিং অবকাঠামো নির্মাণে চিপের ব্যবহার বাড়ায় সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় কোম্পানিটি বড় অঙ্কের মুনাফা অর্জন করেছে।
তবে আর্থিক ফলাফল ভালো হওয়ার পরও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি স্যামসাং। লেনদেনের একপর্যায়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর ৬ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। বিপরীতে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এসকে হাইনিক্সের শেয়ারদর ০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারদরের এই বিপরীতমুখী প্রবণতার পেছনে ভবিষ্যৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে দুই কোম্পানির বক্তব্যের পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এসকে হাইনিক্স উচ্চগতির ডিআরএএম ও উচ্চ ব্যান্ডউইডথ মেমোরি (এইচবিএম) চিপের দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা এবং সরবরাহ নিয়ে আশাবাদী অবস্থান তুলে ধরেছে। অন্যদিকে স্যামসাং জানিয়েছে, আগামী বছর তাদের চিপের মজুত শেষ হয়ে যেতে পারে এবং সরবরাহ ঘাটতি ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের কাছে এই বক্তব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম আশাব্যঞ্জক বলে বিবেচিত হয়েছে।
বাজারে হতাশার আরেকটি কারণ হলো শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক ঘোষণা না আসা। বিনিয়োগকারীদের একাংশ অতিরিক্ত শেয়ার পুনঃক্রয় অথবা লভ্যাংশ বাড়ানোর প্রত্যাশা করছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আগামী জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ায় স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এদিকে চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে বড় বিনিয়োগ করছে স্যামসাং। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর কোম্পানিটির মূলধনী ব্যয় ৬২ শতাংশ বাড়িয়ে ৭৬ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন কোরীয় উওনে উন্নীত করা হয়েছে। আগামী বছরও উৎপাদন অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। কোম্পানিটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এআই অবকাঠামো সম্প্রসারণের কারণে ২০২৭ সালে মেমোরি চিপের চাহিদা আরও বাড়তে পারে এবং সরবরাহের ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি বাজার অবস্থান শক্তিশালী করতে স্যামসাং বড় গ্রাহকদের সঙ্গে সরবরাহ চুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের শীর্ষ ১০ গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি চূড়ান্ত করার পাশাপাশি আরও ১০টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে। ২০৩০ সালের মধ্যে কোম্পানিটির মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
অন্যদিকে স্যামসাংয়ের ফাউন্ড্রি বিভাগ এখনো লোকসানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তবে উন্নত দুই ন্যানোমিটার প্রযুক্তির চিপ তৈরির নতুন ক্রয়াদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে কারখানায় আগামী বছর থেকে টেসলার জন্য চিপ উৎপাদনের পরিকল্পনা ব্যবসাটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বাড়াতে পারে।
তবে চিপের মূল্যবৃদ্ধি কোম্পানিটির নিজস্ব মোবাইল ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করেছে। স্মার্টফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত মেমোরি চিপসহ বিভিন্ন উপাদানের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মুনাফার হার সংকুচিত হয়েছে। ফলে সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি থাকলেও কোম্পানির অন্যান্য বিভাগের ওপর ব্যয়ের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, এআই প্রযুক্তির বিস্তার স্যামসাংয়ের চিপ ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু সরবরাহ সংকটের স্থায়িত্ব, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার তুলনা এবং শেয়ারহোল্ডারদের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়গুলো এখনো বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।