যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিরসনে কাতারের পাঠানো শান্তিচুক্তির খসড়া প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে প্রস্তাবটিকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের অভিযোগ, খসড়ায় এমন কিছু শর্ত রয়েছে, যেগুলো দেশটির পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে প্রস্তাবিত শর্তের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে তেহরান।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত এক ইরানি কর্মকর্তা জানান, কাতারের পাঠানো খসড়াটিকে তেহরান নতুন কোনো কার্যকর শান্তি উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না। তাঁর মতে, প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে ইরানের অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
ইরানের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি। ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, পারমাণবিক ইস্যুতে তেহরান নমনীয় হতে রাজি নয়। অথচ কাতারের প্রস্তাবে এই বিষয়টিকেই বিরোধের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বেসামরিক উদ্যোগ বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ও পারমাণবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছিলেন, সংঘাত বন্ধের উদ্যোগ সফল করতে হলে ইরানকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমাতে হবে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য শান্তি আলোচনার অন্যতম বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৫ অক্টোবর কাতারের পাঠানো খসড়ায় বিবদমান পক্ষগুলোর উদ্বেগ কমাতে সাত দিনের একটি সময়সীমার কথা বলা হয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে প্রতিদিন বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে পারস্পরিক আস্থা তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে ইরানের আপত্তির কারণে প্রস্তাবটি নিয়ে অগ্রগতি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কাও আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার বলেছেন, সরকার গঠন করতে পারলে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সংকট মোকাবিলায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবেন। ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইসরায়েলের প্ররোচনায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে গ্যাসের সরবরাহকারী ও ভোক্তা—উভয় পক্ষই এর পরিণতির মুখে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আরাগচি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সংঘাত শুরু হলে ইয়েমেনে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার বিরোধসহ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, কাতারের মধ্যস্থতায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এখন পারমাণবিক কর্মসূচি, নিরাপত্তা-সংক্রান্ত শর্ত এবং সামরিক উত্তেজনার মতো জটিল প্রশ্নের মুখে রয়েছে। ইরান প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় কূটনৈতিক আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে নতুন আলোচনা বা সংশোধিত প্রস্তাবের উদ্যোগ নেওয়া হলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।