রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে দেশটির কাছে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। উন্নত প্রযুক্তির পিএসি-৩ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রসহ সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম বিক্রির সম্ভাব্য মূল্য ধরা হয়েছে ২১০ কোটি ডলার। তবে অনুমোদন পেলেও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইউক্রেনে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ অনুমোদনের কথা জানায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র কেনার অর্থের জোগান দেবে কানাডা, জার্মানি ও নরওয়ে। পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউক্রেন সহায়তা ঋণের আওতায় বরাদ্দ অর্থও ব্যবহার করা হবে। এ চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি অর্থ ব্যয় হবে না। মার্কিন অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন চুক্তিটির প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, রাশিয়ার অব্যাহত হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের এখনই প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রয়োজন। বিশেষ করে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে এ ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, শীত মৌসুম সামনে রেখে রাশিয়া ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গত দুই সপ্তাহে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে ৩০টির বেশি হামলা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, প্রস্তাবিত বিক্রির মাধ্যমে ইউক্রেনের আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার দেশটির নিরাপত্তা জোরদার হবে। তবে এটি সম্ভাব্য সামরিক বিক্রির অনুমোদন; চূড়ান্ত চুক্তি ও সরবরাহের সময়সূচি নির্ধারণে আরও প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের সরবরাহ নিয়ে ইউক্রেনের উদ্বেগ নতুন নয়। রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় এসব ক্ষেপণাস্ত্রের চাহিদা বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্রসহ মিত্র দেশগুলোর মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ রয়েছে। ফলে নতুন করে উৎপাদন এবং সরবরাহের কারণে ইউক্রেনের হাতে ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও কিয়েভের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন মস্কোর ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করায় ইউক্রেনের অসন্তোষ তৈরি হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধে চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও মন্তব্য করেছিলেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। এর আগে ২০১৪ সালে ক্রিমিয়া দখল এবং পূর্ব ইউক্রেনের দনবাস অঞ্চলের কিছু এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে দেশটি। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের সামরিক ও বেসামরিক অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অনুষ্ঠিত জি-২০ পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা দেখা গেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আয়োজনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের উপস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের আপত্তি ওঠে। এ বিরোধের কারণে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের প্রচলিত আনুষ্ঠানিক গ্রুপ ছবি বাতিল করা হয়।
বৈঠকে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার ভূমিকার সমালোচনা করেন ইউরোপীয় কূটনীতিকরা। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভের উদ্দেশে বলেন, ‘এই যুদ্ধে কে আগ্রাসী, তা আমরা সবাই জানি।’ ইউক্রেনে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির জন্যও রুশ সরকারকে দায়ী করেন তিনি।
সব মিলিয়ে ইউক্রেনকে ৫০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির মার্কিন অনুমোদন কিয়েভের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে সরবরাহে দীর্ঘসূত্রতা থাকলে আসন্ন শীত মৌসুমে রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের তাৎক্ষণিক চাহিদা পূরণে এ সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।