ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে পদ থেকে সরিয়ে কারাগারে পাঠানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও আইনের মুখোমুখি হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। রোববার (১ নভেম্বর) দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন রাহুল।
‘ভোট বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ স্লোগানে আয়োজিত এই সমাবেশের মূল বিষয় ছিল নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ। সমাবেশ থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে নির্বাচনী সমীকরণ বদলানোর চেষ্টা চলছে।
সমাবেশে রাহুল গান্ধী বলেন, দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হলো জ্ঞানেশ কুমারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরানো। এরপর মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আইনের হাত থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকবে না।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রসঙ্গ তুলে রাহুল দাবি করেন, ওই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জোট ও বিরোধীদের ভোটের ব্যবধান ছিল মাত্র তিন শতাংশ। তাঁর অভিযোগ, নির্বাচনের পর ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ৫০ লাখ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ। এ কারণে ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ‘অবৈধ’ ও ‘ভোট চুরির নির্বাচন’ বলেও আখ্যা দেন তিনি।
রাহুলের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার তথ্য নির্বাচন কমিশনের হিসাব থেকেই পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, এটি সাধারণ কোনো চুরির ঘটনা নয়; বরং এর মাধ্যমে দেশের প্রতিটি নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে। এ ঘটনাকে ‘বিরলতম অপরাধ’ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মতো গুরুতর বিষয় হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।
বক্তব্যে নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগ তোলেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর দাবি, দেশের সম্পদ ও অর্থনৈতিক সুবিধা অল্প কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাহুল গান্ধী বলেন, তিনি এমন একটি ভারত চান, যেখানে কৃষক পরিশ্রম করে নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবেন এবং শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষে উপযুক্ত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালিত হওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সমাবেশে রাহুল আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ কিংবা জ্ঞানেশ কুমারের প্রতি তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো ঘৃণা নেই। তবে সংবিধান ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রশ্নে তাঁরা আপস করবেন না। সহিংসতার পথ পরিহার করে ভালোবাসা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের কথাও বলেন তিনি।
সমাবেশে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ইন্ডিয়া জোটের বিভিন্ন দলের নেতারা অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব ও ফারুক আবদুল্লাহসহ অনেকে। এর আগে নেতারা মিছিল নিয়ে রামলীলা ময়দানে পৌঁছান।
তবে বিরোধীদের অভিযোগের বিপরীতে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়ম মেনেই পরিচালিত হচ্ছে। কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, তালিকা থেকে বাদ পড়া নামের মধ্যে মৃত, স্থানান্তরিত ও একাধিকবার অন্তর্ভুক্ত ভোটারের নাম রয়েছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধী জোটের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যার মধ্যে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।