যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোট দেবেন দেশটির নাগরিকেরা। এই নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের রাজনৈতিক সমীকরণ। বিশেষ করে কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে রিপাবলিকান পার্টির। তবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ইরান যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের সামনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, নির্বাচনী তহবিল ও বিজ্ঞাপন প্রচারে এগিয়ে থাকার কারণে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার আশা করছে রিপাবলিকানরা।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের আশাবাদের অন্যতম কারণ ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা। নির্বাচনী জরিপ বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার হার ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। পরে তা কমে ৪০ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। বর্তমানে এই হার প্রায় ৩৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দলের আসন হারানোর প্রবণতা রয়েছে। ১৯৩৪ সালের পর থেকে এসব নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। গত ২৩টি মধ্যবর্তী নির্বাচনের মধ্যে মাত্র তিনবার প্রেসিডেন্টের দল আসন বাড়াতে পেরেছে।
প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সুযোগ
৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সদস্যসংখ্যা ২১৮, আর ডেমোক্র্যাটদের ২১৪। ফলে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান খুবই সামান্য। এবার প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনেই নির্বাচন হচ্ছে।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১৮টি আসনে দুই দলের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস রয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি আসন বর্তমানে রিপাবলিকানদের এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। এসব আসনের ফলই প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সিনেটে কঠিন সমীকরণ
১০০ সদস্যের সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৫টি আসন। বাকি দুটি আসনে থাকা স্বতন্ত্র সদস্যরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন। এবারের নির্বাচনে সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হবে।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের হিসাবে, সাতটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে বেশি। এর ছয়টি রিপাবলিকান এবং একটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। ফলে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের আসন ধরে রাখার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের একাধিক আসনে জয় পেতে হবে। মিশিগান, আলাস্কা, আইওয়া, ওহাইও ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যের ফল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান যুদ্ধ বড় ইস্যু
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের কাছে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম বড় আলোচনার বিষয়। নির্বাচনী প্রচারে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়।
এ ছাড়া ইরান পরিস্থিতি সামলানোর ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। আগস্টের এক জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এ বিষয়ে ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসননীতিও ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
প্রচারে অর্থের লড়াই
নির্বাচনী প্রচার ও বিজ্ঞাপনে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর হাতে নগদ অর্থ ছিল প্রায় ৩২ কোটি ডলার। একই সময়ে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল প্রায় ২৩ কোটি ডলার। এ ছাড়া ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ আন্দোলনের তহবিল সংগ্রহকারী সংগঠন মাগা ইনকের কাছেও ১৬ কোটি ডলারের বেশি অর্থ রয়েছে।
২০২৮ সালের নির্বাচনেও প্রভাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন পাস ও নীতিমালা বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে। অন্যদিকে, দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে রিপাবলিকানরা নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে।
সব মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করবে না, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই দলের রাজনৈতিক কৌশলেও প্রভাব ফেলবে।