চলমান শ্রমিক আন্দোলন মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বিবেচনায় নিয়ে নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি ঘোষণা করতে মজুরি বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে সংশোধিত সাইবার সুরক্ষা আইনের খসড়া পর্যালোচনা-সংক্রান্ত সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
শ্রমিকদের চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে শুধু শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কোথাও কোথাও আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক এজেন্ডা কিংবা সহিংসতা চলছে কি না, সেটিও নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। পরিস্থিতির প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পোশাকশ্রমিকদের অন্যতম দাবি ছিল নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করা। সরকার এ বিষয়ে আগেই উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি মনোনয়নে কিছুটা সময় লাগায় বোর্ড গঠনে বিলম্ব হয়। শ্রমিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দেওয়ার পরদিনই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। বুধবার বোর্ডের প্রথম সভাও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
নতুন মজুরি নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, বোর্ডে মালিক ও শ্রমিক—উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য শুনে একটি যৌক্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করবেন। এ ক্ষেত্রে অতীতে পাঁচ বছর পরপর মজুরি বৃদ্ধির হার, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মালিকপক্ষের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নতুন মজুরি নির্ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা। রপ্তানি বৃদ্ধি, অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণেও সরকার কাজ করছে বলে জানান তিনি।
এদিকে চলমান শ্রমিক আন্দোলনের নামে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কিছু ঘটনায় শ্রমিকদের প্রকৃত দাবি সামনে না রেখে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে। কয়েকটি স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যানবাহনে হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনার সঙ্গে অতীতে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী ছিলেন—এমন কয়েকজন শিল্পমালিকের সংশ্লিষ্টতার বিষয় সামনে এসেছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। পাশাপাশি মাফিয়া ও প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ থেকেও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে পরিস্থিতি উসকে দেওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের ফলাফল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের যেকোনো ন্যায্য দাবি নিয়ে আলোচনায় বসতে সরকার প্রস্তুত। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সরকারি সংস্থাগুলো কাজ করছে। মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক নেতাদের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। তাঁদের কেউ কেউ সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনাগুলোকে শ্রমিকদের স্বাভাবিক আন্দোলনের অংশ নয় বলে মত দিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আহত হয়েছেন। কেউ কেউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এরপরও শ্রমিকদের ওপর যথাসম্ভব বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংযম ও সতর্কতা বজায় রাখতে বাহিনীগুলোকে বলা হয়েছে।
আন্দোলনরত শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন অব্যাহত রাখা জরুরি। নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। তাই আলোচনার মাধ্যমে দাবি-দাওয়া নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, এ অবস্থায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই।
নতুন মজুরি কার্যকরের সময়সীমা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আগামী ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মজুরি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই মজুরি ঘোষণা করতে বোর্ডকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগেভাগে ঘোষণা দেওয়া সম্ভব হলে শ্রমিক ও মালিক উভয় পক্ষের জন্য তা ইতিবাচক হবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরীর আটকের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তিনি আটক হয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই। তবে আটক হয়ে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
সব মিলিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা, শিল্পকারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং চলমান সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে সরকার বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।