যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যুক্ত করলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ড. আবদুল এল-সাঈদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে দেশটির সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। তাঁর এই জয়কে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রগতিশীল ধারার জন্যও বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বুধবার (৪ নভেম্বর) ভোরে ডেট্রয়েটে দলীয় সদর দপ্তরে সমর্থকদের সামনে বিজয় ঘোষণা করেন এল-সাঈদ। বিজয়ী ভাষণে তিনি বলেন, ‘আপনারা এমন একজন প্রার্থীর ওপর আস্থা রেখেছেন, যাঁকে অনেকেই অসম্ভাব্য প্রার্থী মনে করেছিলেন। ধন্যবাদ। এই জয় আপনাদের সবার।’
মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান ৪২ বছর বয়সী এল-সাঈদ পেশায় চিকিৎসক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি জনস্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে কোনো নির্বাচিত পদে দায়িত্ব পালন করেননি তিনি। আট বছর আগে মিশিগানের ডেমোক্র্যাটিক গভর্নর প্রাইমারিতে বড় ব্যবধানে পরাজিত হলেও এবার সরাসরি মার্কিন সিনেটের আসন জয় করে আলোচনায় এসেছেন।
তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, রাজনীতিতে করপোরেট অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ। বিশেষ করে ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ কর্মসূচির মাধ্যমে সবার জন্য সরকারি অর্থায়নে স্বাস্থ্যসেবা চালুর পক্ষে প্রচার চালান তিনি। পাশাপাশি নির্বাচনে বাইরের অর্থের প্রভাব কমানো এবং ইসরায়েলের নীতির সমালোচনাও ছিল তাঁর প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রচারণায় প্রগতিশীল রাজনীতিকদের সমর্থন পেয়েছেন এল-সাঈদ। তাঁর পক্ষে মাঠে নামেন কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-করতেজ এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সসহ দলের প্রগতিশীল ধারার নেতারা। সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও ডেট্রয়েটে তাঁর পক্ষে ভোটারদের সংগঠিত করার প্রচারে অংশ নেন।
তবে নির্বাচনী লড়াইটি তাঁর জন্য সহজ ছিল না। ডেমোক্র্যাটিক প্রাইমারিতে কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে পরাজিত করে দলীয় মনোনয়ন পান এল-সাঈদ। ওই প্রাইমারিতে বিপুল অঙ্কের বাইরের নির্বাচনী অর্থ ব্যয় হয়। পরে নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে স্টিভেন্স রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন দেন। এতে ডেমোক্র্যাট শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভাজন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান শিবির থেকেও এল-সাঈদকে ঘিরে নানা আক্রমণাত্মক প্রচারণা চালানো হয়। তাঁর ধর্মীয় পরিচয় ও নামকে সামনে এনে তাঁকে উগ্রপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ তোলা হয়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো। এল-সাঈদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ডেমোক্র্যাট নেতারা এ ধরনের প্রচারণাকে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য হিসেবে সমালোচনা করেন।
ইসরায়েলবিষয়ক তাঁর অবস্থান নিয়েও নির্বাচনী প্রচারণায় বিতর্ক তৈরি হয়। ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা এবং গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সমালোচনার কারণে কিছু ইহুদি ভোটারের সমর্থন পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে ডেট্রয়েটের কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের উপস্থিতি ও সমর্থন নিয়েও ডেমোক্র্যাট শিবিরে উদ্বেগ ছিল।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জাতীয় পর্যায়ের রিপাবলিকান নেতারা সমর্থন দেন। তবে ইরান যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির প্রভাব নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগের মুখে তাঁকে প্রচারণা চালাতে হয়। নির্বাচনের শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার পক্ষেও বক্তব্য দেন রজার্স।
অবসর নিতে যাওয়া দুই মেয়াদের ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্সের আসনে জয়ী হয়ে এল-সাঈদ আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলেই রাখলেন। মিশিগানের এই জয় যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে প্রথম মুসলিম প্রতিনিধির প্রবেশের পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যেও প্রগতিশীল কর্মসূচি নিয়ে নির্বাচনে জয় পাওয়া সম্ভব—এমন যুক্তি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বামপন্থী নেতৃত্বের সামনে।
তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স ও দ্য গার্ডিয়ান।