সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে এক যুবককে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে এক বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। নিহতের নাম রাজু আহমেদ (৩৮)।
রোববার রাতে উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরহোগলা বালুরঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় আরো ৩ জন আহত হয়।
নিহত রাজু আহমেদ ওই এলাকার আয়নাল হকের ছেলে। তিনি স্থানীয় বিএনপির তৃণমূল রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রাজু পাশাপাশি গরুর খামার পরিচালনা করতেন। তাঁর পরিবারে স্ত্রী, দুই ছেলে, বাবা-মা এবং ভাই-বোন রয়েছেন।
নিহতের পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। তবে পুলিশ বলছে,এটি রাজনৈতিক নাকি পারিবারিক বিরোধের জেরে সংঘটিত হয়েছে, তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রাজু একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকলেও প্রায় চার মাস আগে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহাদাত প্রধানের সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সোমবার ( ২৭ জুলাই) সোনারগাঁও থানায় একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এদিকে এলাকাবাসীর অভিযোগ, চরহোগলা এলাকার মোতালেব প্রধানের ছেলে বিএনপির নেতা শাহাদাত প্রধান ওই এলাকার যুবদল নেতা শান্ত হত্যা মামলার ২নং আসামী। সে ডিবি হারুনের সোর্স হিসেবে পরিচিত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলাসহ ১০-১২টি মামলার চিহ্নিত আসামী শাহাদাত প্রধান। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ সোমবার চরহোগলা এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি দেশীয় নষ্ট শর্টগান ও ৩ রাউন্ড কার্তুজ গুলি উদ্ধার করে।
অপরদিকে রাজু হত্যার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতংক বিরাজ করছে। সোমবার দুপুরে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা শাহাদাতের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করে। তারা তার সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবি জানান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার রাত ১১টায় উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চরহোগলা বালুরঘাট এলাকায় রাজুর ফুফাতো ভাই ইয়ামিনের সঙ্গে স্থানীয় নুরুল ও জাকিরের বাকবিতন্ডা হয়। পরে বিষয়টি মারামারিতে রূপ নেয়। এসময় রাজু গিয়ে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করেন। পরে নুরুল ও জাকিরের নেতৃত্বে ১৫-২০ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাজুর বাড়িতে হামলা চালায়। হামলাকারীরা রাজু ও তার ফুফাতো ভাই ইয়ামিনকে পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাত করে গুরুতর আহত করে। তাঁকে রক্ষা করতে গেলে পরিবারের রাজুর মা ও বোনকেও মারধর করা হয়।
নিহত রাজুর মা সালেহা বেগম জানান, রোববার রাতে রাজুর ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে স্থানীয় নুরুল ও জাকিরের কথা-কাটাকাটি এবং পরে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে রাজু সেখানে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কিছুক্ষণ পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে শাহাদাত বাহিনী প্রধানের সহযোগি নুরুল ও জাকিরের নেতৃত্বে শাহাদাতের হুকুমে সাইফুল, পলাশ, জাহিদসহ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালায়।
পরিবারের অভিযোগ, হামলাকারীরা রাজুর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। তারা রাজু ও তার ফুফাতো ভাই ইয়ামিনকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা হয়। এ সময় তাঁকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে রাজুর মা সালেহা বেগম ও বড় বোন সোনিয়া বেগমকে মারধর করা হয়। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে আহতদের উদ্ধার করেন। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় রাজুকে মুন্সীগঞ্জ সদর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আহত অন্যদেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
নিহতের বড় বোন সোনিয়া বেগম বলেন, রাজু দীর্ঘদিন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও প্রায় চার মাস আগে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহাদাত প্রধানের সঙ্গে তাঁর বিরোধের সৃষ্টি হয়। সেই বিরোধের জের ধরেই পরিকল্পিতভাবে তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ। এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে এলাকাবাসী বলেন, শাহাদাত প্রধান স্থানীয় যুবদল নেতা শান্ত হত্যা মামলার ২নং আসামী। শাহাদাত ডিবি হারুনের সোর্স হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলাসহ ১০-১২টি মামলা রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শাহাদাত বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে চর কিশোরগঞ্জ, চর হোগলা এলাকায় আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছে। সাধারণ মানুষ আজ নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।
শম্ভুপুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিহত রাজু বিএনপির কোনো পদধারী নেতা নয়। তবে বিএনপির সমর্থক ছিলো। বর্তমানে সে একটি গরু খামারি বলে জানতে পেরেছি। অভিযুক্ত বিএনপি নেতার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে যান।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত শাহাদাত হোসেন বলেন, ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি ও তার বাবা নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করছিলেন। নুরুল ও জাকিরের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ রয়েছে। এ বিরোধের জেরেই এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। তিনি ও তার পরিবারের কোনো সদস্যের এ ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।
সোনারগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আনোয়ার হোসেন বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তিনি আরও বলেন, এটি রাজনৈতিক বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব নাকি অন্য কোনো কারণে ঘটেছে, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আলামত ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে। তদন্তে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।