জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সামান্তা শারমিন। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠন, দলের রাজনৈতিক কৌশল, নারীর অধিকার এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, জামায়াত নীতিগত বা কৌশলগত কোনো ক্ষেত্রেই এনসিপির মিত্র হওয়ার যোগ্য নয়। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে দেওয়া এক দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন। সে সময়ই তিনি সতর্ক করেছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে রাজনৈতিকভাবে কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে। পদত্যাগের পেছনে তিনি মূলত চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন।
প্রথমত, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জামায়াতকে উপযুক্ত মিত্র মনে করেন না তিনি। সামান্তা শারমিনের ভাষ্য, এনসিপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা। এ জন্য সংবিধান, আইন, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু জামায়াত এসব সংস্কারকে নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ধারণ করে না বলে তাঁর অভিযোগ। তিনি আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই দলটি সংস্কারের কথা বলছে।
সামান্তা শারমিনের মতে, জামায়াতকে সংস্কারের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করায় উদার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মানুষের একটি অংশ এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান থেকে দূরে সরে গেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে দলটিকে জামায়াতের সহায়ক ভূমিকায় যেতে হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচনী কৌশল নিয়ে এনসিপির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, ২০২৬ সালের নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানোর সম্ভাবনা ছিল। পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রত্যাশী শক্তিগুলোর সঙ্গে জোট করা অথবা এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিকল্প এনসিপির সামনে ছিল। কিন্তু দলটি বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সামান্তা শারমিন জানান, ১১ দলীয় ঐক্যের মতো নির্বাচনী কৌশলে অংশ না নিয়েও কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানো সম্ভব, সে বিষয়ে তিনি দলের নেতৃত্বকে পাঁচটি পদ্ধতির কথা জানিয়েছিলেন। তবে নেতৃত্ব তাঁর প্রস্তাবগুলো অনুসরণ করেনি। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিবর্তনের চেয়ে নির্বাচনী জয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় এনসিপি নিজেদের সংস্কারভিত্তিক অবস্থান দুর্বল করেছে।
তৃতীয়ত, গণঅভ্যুত্থানে নারীদের ভূমিকা ও অধিকার যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। সামান্তা শারমিন বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা শুধু অংশগ্রহণই করেননি, বরং প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং আন্দোলনকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কিন্তু আন্দোলনের পর নারীদের রাজনৈতিক মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলে তাঁর অভিযোগ।
এনসিপির বিরুদ্ধেও নারীদের নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতায় যথাযথ অবস্থান নিশ্চিত না করার অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, নারীদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের মতামত ও প্রতিবাদকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা মানে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও আকাঙ্ক্ষাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বাইরে রাখা। নারীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
চতুর্থত, এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে মানুষ এমন একটি রাজনৈতিক দল প্রত্যাশা করেছিল, যার সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাউন্সিল আয়োজন না করে আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন করায় দলের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, কাউন্সিল ছাড়া কমিটি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এনসিপি পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতোই বিরোধী মত উপেক্ষা ও দমনের প্রবণতা অনুসরণ করেছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের আগেই বড় ধরনের সাংগঠনিক পরিবর্তন দলের নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিবৃতিতে সামান্তা শারমিন বলেন, এসব বিষয়ে দলের নেতৃত্বকে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেও এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। এ কারণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
পদত্যাগের পর নিজের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্যের রাজনীতির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি, যার ভিত্তি হবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, নারীর সমান অংশগ্রহণ, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার এবং জনগণের স্বার্থ। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য বা বিরাগ নয়, বরং বাংলাদেশের স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
বিবৃতির শেষাংশে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে আগ্রহীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের আহ্বান জানান সামান্তা শারমিন। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রচেষ্টা এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি। তাঁর এসব বক্তব্য এনসিপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং জামায়াতের সঙ্গে জোটের প্রশ্নে দলের ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।