ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে চূড়ান্ত উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পরিবর্তে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছেন নেসেটের ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দলগুলো। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছে ৪৬ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দল। এ পরিস্থিতিতে আগামীকাল রোববার (৮ নভেম্বর) নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগ।
গত বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠকের পর এই সমর্থনের হিসাব সামনে আসে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার সমর্থন পেলেও আইজেনকটের সরকার গঠনের পথ এখনো সহজ নয়। কারণ নেতানিয়াহুবিরোধী ছয়টি দল তাঁর প্রতি সমর্থন জানালেও তাদের মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য রয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইজেনকটের দল ইয়াশার দ্রুত তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট হেরজগ জানিয়েছেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে আরও আলোচনা করবেন।
নেতানিয়াহুবিরোধী ছয়টি দলের মধ্যে চারটি ইহুদি নেতৃত্বাধীন দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন ৪৮ জন আইনপ্রণেতা। অন্যদিকে দুটি আরব নেতৃত্বাধীন দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন ১৯ জন। ছয়টি দলই আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দিলেও ইহুদি নেতৃত্বাধীন তিনটি দল আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে রাজি নয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন থাকা সত্ত্বেও সংসদীয় সমঝোতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর বিদায়ী জোট নির্বাচনে ৫৩টি আসন পেয়েছে। তবে সাত আসনের ইউনাইটেড তোরাহ জুদাইজম দল তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দেয়নি। এদিকে ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির চেয়ারম্যান আভিগদর লাইবারম্যান অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করছেন। রাজনৈতিক আলোচনায় আইজেনকট ও লাইবারম্যানের মধ্যে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সমঝোতার সম্ভাবনাও উঠে এসেছে।
নতুন সরকার গঠনের আলোচনা চলার মধ্যেই নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ক্ষমতা ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। বিরোধী রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের দাবি, নির্বাচনের ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং ক্ষমতায় থাকার পথ তৈরি করতে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
মিডল ইস্ট আইয়ের ৫ নভেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের রেকর্ডসংখ্যক ভোট পড়ার পর নেতানিয়াহুর জোট বিরোধীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। এরপর ফিলিস্তিনি ভোট নিয়ে তদন্ত শুরু করে শিন বেত। সংস্থাটির প্রধান ডেভিড জিনির নেতৃত্বে ভোট জালিয়াতি, ঘুষ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট দলকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। দল দুটি নেসেটে মোট ১৯টি আসন পেয়েছে। গত মঙ্গলবার শিন বেত সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সহযোগী লেখক আবদ আবু শাহাদেহকে আটক করে। পাশাপাশি কয়েকজন ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধী নেতারা। ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান অভিযোগ করেছেন, ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। তাঁর দাবি, পুলিশ বিনা পরোয়ানায় রাজনৈতিক কর্মীদের আটক করছে এবং শিন বেত কোনো প্রমাণ ছাড়াই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা করছে। তিনি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টার অভিযোগও তুলেছেন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা সংস্থার ভেতরে সরকারের অনুগত ব্যক্তিদের ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহু।
অন্যদিকে গাদি আইজেনকটও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করার অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর মতে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে উসকানি, রাজপথে সহিংসতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দুর্বল করার মাধ্যমে একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নেতানিয়াহু কিংবা তাঁর সরকারের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে একদিকে সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার আলোচনা, অন্যদিকে গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকা ও নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক—সব মিলিয়ে ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এখন প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গন।