যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার মুখে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে রাশিয়ার সহযোগিতা চাইছে ইরান। এ লক্ষ্যে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অত্যাধুনিক এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান দীর্ঘদিন ধরেই রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এবার সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার ইরানের নিরাপত্তাপ্রধান মোহসেন রেজাইকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে মস্কোয় পাঠান মোজতবা খামেনি। ওই চিঠিতে মূলত এস-৪০০ ব্যবস্থা সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে বলে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মস্কোয় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর মোহসেন রেজাই জানান, দুই দেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ছাড়া রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
ইরানের এই উদ্যোগকে দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষার বিষয়টি তেহরানের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলা এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পরিকল্পনা করছে ইরান। এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে একাধিক অস্ত্র সরবরাহ চুক্তি হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগেই ইরানের সংসদের একটি গোপন কমিটি দেশটির প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে বেশ কিছু সুপারিশ তৈরি করেছিল। সেখানে চীন ও রাশিয়ার মতো বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি আকাশ প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশও ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এস-৪০০ ব্যবস্থা পাওয়ার চেষ্টা ইরানের প্রতিরক্ষা নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। অত্যাধুনিক এই রুশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দূরপাল্লার বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত এবং প্রতিহত করার সক্ষমতার জন্য পরিচিত। ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা, আকাশসীমা ও কৌশলগত অবকাঠামোর নিরাপত্তা জোরদার করা।
তবে ইরানের অনুরোধে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কো বহু বছর ধরে তেহরানকে এ ধরনের অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
এ ছাড়া ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে রাশিয়ার নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। ইউক্রেনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি এবং বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে। ফলে নিজেদের প্রতিরক্ষা চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে এস-৪০০-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ইরানকে সরবরাহ করতে মস্কো কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সামরিক সহযোগিতা বাড়ানোর এই উদ্যোগ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা করছে না। তবে রেজাই-পুতিন বৈঠক এবং এস-৪০০ নিয়ে আলোচনার খবর দুই দেশের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুনর্গঠন এবং রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে এস-৪০০ সরবরাহের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।