ইসরায়েলের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে পেছনে ফেলে নতুন জোট সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পেয়েছেন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ তাঁকে সরকার গঠনের ম্যান্ডেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনে কোনো পক্ষই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দায়িত্ব পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় আইজেনকোট বলেন, এখন একটি জাতীয় জরুরি সরকার গঠনের সময়। এই দায়িত্ব পালনের যোগ্য হয়ে উঠতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করবেন বলেও জানান। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য প্রাথমিকভাবে তাঁকে ২৮ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে এ সময়সীমা আরও ১৪ দিন বাড়ানো যেতে পারে।
ইসরায়েলের ১২০ আসনের নেসেট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী লিকুদ পার্টি এবং তাদের কট্টর-ডানপন্থী ও আল্ট্রা-অর্থোডক্স মিত্ররা সম্মিলিতভাবে ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে আইজেনকোটের মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টি এবং তাঁর সঙ্গে থাকা তিনটি বিরোধী দল মিলে পেয়েছে ৪৮টি আসন। ফলে কোনো পক্ষের জন্যই এককভাবে সরকার গঠন করা সম্ভব হয়নি।
এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে আরব-নেতৃত্বাধীন দুটি জোট—ইউনাইটেড আরব লিস্ট ও জয়েন্ট লিস্ট। তারা যৌথভাবে ১৯টি আসনে জয়ী হয়েছে। সরকার গঠনের ক্ষেত্রে এখন তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নির্বাচনের আগে ইহুদি দলগুলোর অধিকাংশই আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই অবস্থান কতটা বজায় থাকবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আইজেনকোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতা এবং নেতানিয়াহুর পক্ষে ৪৬ জন সমর্থন জানিয়েছেন। আইন অনুযায়ী, ইসরায়েলে সর্বাধিক আসন পাওয়া দলের নেতাকেই সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। বরং যিনি সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন নিয়ে কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবেন বলে মনে হয়, প্রেসিডেন্ট তাঁকেই এই দায়িত্ব দিতে পারেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য কয়েকটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য সরকার গঠন, আইজেনকোটের শিবির থেকে সমর্থন নিয়ে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট পুনর্গঠন অথবা আরব দলগুলোর সমর্থনে আইজেনকোটের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। এ ছাড়া আল্ট্রা-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গেও সমঝোতার চেষ্টা হতে পারে।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে জোট সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা নতুন নয়। ২০২০ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গ্যান্টজ ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তিতে পৌঁছেছিলেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার অভাবে দেশটিকে একাধিকবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।
এবারও সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে ইসরায়েল নতুন করে রাজনৈতিক সংকটে পড়তে পারে। তাই প্রেসিডেন্ট হারজোগ দলগুলোর প্রতি সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন আইজেনকোট কতটা সমর্থন আদায় করতে পারেন এবং বিরোধী ও ডানপন্থী দলগুলোর মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা হয়, তার ওপর নির্ভর করছে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের রূপরেখা।