পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ও অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র ক্রাকোভে ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটেছে। শহরটির ঐতিহাসিক প্রধান চত্বরে এক বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন। পরে হামলাকারীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জন। আহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন। এ ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
শনিবার (৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় বেলা ৩টার দিকে ক্রাকোভের ঐতিহাসিক প্রধান চত্বরে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পোলিশ কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, চরম উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শে প্রভাবিত হয়ে ২৪ বছর বয়সী এক তরুণ এই হামলা চালিয়েছেন। তবে হামলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও এর পেছনে অন্য কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, সেনাবাহিনীর পোশাক পরা ওই তরুণ একটি কালো রঙের গাড়ি নিয়ে চত্বরে প্রবেশ করেন। এরপর গাড়ির জানালা দিয়ে এআর-১৫ রাইফেল ব্যবহার করে আশপাশের লোকজনকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন। আকস্মিক এই হামলায় পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা ও পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে অনেকে আশপাশের দোকান, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ভবনে আশ্রয় নেন।
হামলার পর ঘটনাস্থলে পৌঁছে পুলিশ ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করে। নিহতদের মধ্যে চারজন নারী ও দুজন পুরুষ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিকও রয়েছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া হামলায় বিভিন্ন দেশের নাগরিকসহ অন্তত ১৭ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে অস্ট্রিয়া, জার্মানি, পর্তুগাল, রাশিয়া ও ব্রিটেনের নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্যও রয়েছেন বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
এদিকে হামলার পরপরই পুলিশ অভিযান শুরু করে। ঘটনার মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে পাল্টা গুলি চালিয়ে হামলাকারীকে পরাস্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হলেও স্থিতিশীল বলে জানা গেছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড তুস্ক জানিয়েছেন, হামলাকারীর নিজ শহর ওস্ট্রোউইক শুইতোশিস্কিতে তাঁর বাড়িতে নিরাপত্তা ড্রোন পাঠিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। ক্রাকোভ থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের ওই বাড়ি থেকে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুই নারী ও একজন পুরুষ রয়েছেন। তাঁরা হামলাকারীর পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। এ নিয়ে হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে নয়জনে।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারসিন কিয়েরউইনিস্কি জানান, পুলিশের দ্রুত ও সাহসী পদক্ষেপের কারণে আরও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ২৪ বছর বয়সী হামলাকারীর বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। তাঁর ব্যবহৃত গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও উদ্ধার করা হয়েছে।
হামলার পেছনের কারণ ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পোল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে। হামলাকারী এককভাবে এ ঘটনা ঘটিয়েছেন, নাকি এর সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত—তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে ভয়াবহ এই হামলার ঘটনায় আগামী ৮ ও ৯ নভেম্বর দুই দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে পোল্যান্ড সরকার। দেশটির প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকির মুখপাত্র এ তথ্য জানিয়েছেন। জাতীয় শোক চলাকালে নিহতদের স্মরণে রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হবে।
নিরাপদ দেশ হিসেবে পরিচিত পোল্যান্ডে এমন ভয়াবহ বন্দুক হামলার ঘটনায় ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক ও বিস্ময়কর আখ্যা দিয়ে পোল্যান্ডের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাসও এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রভাব পোল্যান্ডের সীমান্ত ছাড়িয়ে ইউরোপজুড়েই অনুভূত হবে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স।