এক সন্তানের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আরেক সন্তানকে হারানোর আশঙ্কায় দিশেহারা চট্টগ্রামের বাবা মোহাম্মদ কবীর। নয় বছরের ছেলেকে বাঁচাতে একের পর এক চারটি হাসপাতালে ছুটেছেন তিনি। কয়েক দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায়নি সন্তানকে। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশু নূর মোহাম্মদ আরাফাত। অন্যদিকে একই হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছে তাঁর মাত্র ১০ মাস বয়সী আরেক ছেলে মোহাম্মদ আবু বক্কর। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নয় বছর বয়সী আরাফাত পাঁচলাইশের হিলভিউ পাবলিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। প্রায় ১৮ থেকে ২০ দিন আগে তার জ্বর, বমি ও কাশি শুরু হয়। পরে চিকিৎসকদের পরীক্ষায় তার শরীরে হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়া শনাক্ত হয়। এরপর থেকেই সন্তানকে সুস্থ করে তুলতে শুরু হয় বাবার হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি।
প্রথমে আরাফাতকে সাউদার্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসা চলার পর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে মেরিন সিটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর ইম্পেরিয়াল হাসপাতালে আরও চার দিন আইসিইউতে রাখা হলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। সর্বশেষ গত সোমবার তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শুক্রবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় শিশুটি। পরে নগরীর মোমেনবাগ কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
কিন্তু বড় ছেলেকে হারানোর শোকের মধ্যেই আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন কবীর। তাঁর ১০ মাস বয়সী ছোট ছেলে আবু বক্করও হাম, ডেঙ্গু ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। তাকেও তিনটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু শারীরিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় গত শনিবার সকালে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।
সন্তানের এমন সংকটাপন্ন অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাবা মোহাম্মদ কবীর। তিনি জানান, লাইফ সাপোর্টে থাকা ছোট ছেলেকে দেখেও তিনি কোনো আশার কথা শুনতে পারছেন না। চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানোর কথা জানালেও সন্তানের নিথর অবস্থায় পড়ে থাকা তাঁকে ভীষণভাবে ভেঙে দিচ্ছে। মাত্রই এক সন্তানকে দাফন করে এসে আরেক সন্তানকে হারানোর আশঙ্কা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (পিআইসিইউ) প্রধান ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দিদারুল আলম জানান, দুই শিশুকেই অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। তারপরও চিকিৎসকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনো ছোট শিশুটিকে বাঁচানোর আশা ছাড়েননি তাঁরা।
তিনি আরও জানান, কোনো শিশু একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। আবু বক্করের ক্ষেত্রেও এমন জটিলতা দেখা দিয়েছে। চিকিৎসক দল শিশুটির জীবন রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম শহরের হিলভিউ এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী আমেনা বেগম ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন কবীর। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পণ্য খালাসের কাজ করেন। দুই সন্তানের চিকিৎসা করাতে গিয়ে ইতোমধ্যে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার বেশি ব্যয় করেছেন। নিজের সঞ্চয় শেষ হওয়ার পর আত্মীয়স্বজন ও সহকর্মীদের কাছ থেকেও ঋণ নিতে হয়েছে তাঁকে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ২১ জন নারী ও ১১টি শিশু রয়েছে। অন্যদিকে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগরীতে ৩৫ জন এবং বিভিন্ন উপজেলায় ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একদিকে সন্তানের মৃত্যুর শোক, অন্যদিকে আরেক সন্তানকে বাঁচানোর আকুতি—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে কবীরের পরিবারের। দুই শিশুর অসুস্থতা ও চিকিৎসার ব্যয় পরিবারটির ওপর যে ভয়াবহ চাপ তৈরি করেছে, তা নতুন করে শিশুদের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি এবং সময়মতো চিকিৎসার গুরুত্ব সামনে নিয়ে এসেছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার।