বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিন দফায় ১০ দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার ও বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তিনি। তবে একাধিক প্রশ্নের উত্তর কৌশলে এড়িয়ে গেছেন এবং অনেক বিষয়ে নীরব থেকেছেন বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র।
শনিবার (৭ নভেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. মনিরুল ইসলাম শুনানি শেষে দ্বীপকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
জিজ্ঞাসাবাদ সম্পর্কে নৌপুলিশ জানিয়েছে, মামলার ঘটনা সম্পর্কে আসামি দ্বীপ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এসব তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময় দ্বীপ অত্যন্ত কৌশলী আচরণ করেছেন। একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে এড়িয়ে গেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তিন দফায় মোট ১০ দিনের রিমান্ডে দ্বীপকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গত ২৭ অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন।
দ্বীপের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিনি তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। এরপর দুজন একসঙ্গে একটি মোটরসাইকেলের গ্যারেজে যান এবং সেখানে মোটরসাইকেলের কাজ করান। পরে মামলার অপর আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা একাধিকবার সিপি ফাইভ স্টারে গিয়ে স্ন্যাকস খান।
এরপর রাতের দিকে তিনজন নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে যান। সেখানে তাঁরা বিয়ার পান ও ধূমপান করেন। একপর্যায়ে জেরিকা তাসনিম দিশা বাসায় ফিরে যান। পরে তাহসিফ ও দ্বীপ একসঙ্গে রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছান।
দ্বীপের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখান থেকে তাঁরা বস্তির ভেতর দিয়ে তুরাগ নদের তীরবর্তী একটি মাঠে যান। মাঠে কয়েকজন ব্যক্তিকে দেখতে পেয়ে তাঁরা একপর্যায়ে পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যান। তবে সেখানে কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তাহসিফের মৃত্যু হলো, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা বিস্তারিত তথ্য যাচাই করছেন।
এদিকে তিন দফায় রিমান্ড শেষে শনিবার দ্বীপকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গাজীপুরের টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুতাসিম বিল্লাহ প্রথমবারের মতো দ্বীপের জামিনের আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। পরদিন ২৮ অক্টোবর তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের বাবা এ কে এম এনায়েতুল করিম বাদী হয়ে উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় প্রাথমিকভাবে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। পরে সন্দেহভাজন হিসেবে আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দ্বীপকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর আগে গত ৩১ অক্টোবর প্রথম দফায় দ্বীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে ৩ নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় তিন দিন এবং ৫ নভেম্বর তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। সব মিলিয়ে ১০ দিন পুলিশি হেফাজতে রেখে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
এ মামলায় অপর আসামি জেরিকা তাসনিম দিশাকেও কয়েক দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল। গত ১ নভেম্বর তাঁর চার দিনের এবং ৪ নভেম্বর আরও তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে গত শুক্রবার তাঁকেও কারাগারে পাঠানো হয়।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার রাতে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তুরাগ নদের তীরবর্তী মাঠে কী ঘটেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। দ্বীপের দেওয়া তথ্য যাচাই এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে মামলার রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।