সোনারগাঁও ( নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে এক স্কুল শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত ও লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল ঘটনায় অভিযুক্ত কিশোর দিলসাদ হোসেনকে রংপুরে তার গ্রামের বাড়ি থেকে এনে সমাজ সেবা বিভাগের প্রবেশন কর্মকতার তত্ত্বাবধানে পরিবারের জিম্মায় দিয়েছে পুলিশ।
শনিবার বিকেলে তাকে সোনারগাঁও থানার থানার আনা হয়। পরে সেখানে ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী ও অভিযুক্ত কিশোরের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এদিকে স্কুল ছাত্রীকে টিসি দেওয়ার জেরে স্থানীয়দের মধ্যে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীকে টিসি দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি স্কুল কর্তৃপক্ষের। তবে ওই শিক্ষার্থীদের টিসি দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি জানিয়েছেন, দুই শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময়ে স্কুল ফাঁকি দিয়ে বাইরে অবস্থান করে। তাদের পরিবারকে তাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে এমন করলে চিঠির মাধ্যমে টিসি দেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্কুল ড্রেস পরা এক ছাত্রীকে শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের ওয়াকওয়েতে পেছন থেকে লাথি মারছে এক কিশোর। ছাত্রীটি প্রতিবাদ করার পরও তাকে আবার লাথি মারা হয়। পরে ভিডিওটি ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা হয়।
পরে স্থানীয় লোকজন অভিযুক্ত কিশোরকে ধরে নিয়ে সালিস করেন। সেখানে তাকে কান ধরে ওঠবস করানো হয় এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার জন্য ক্ষমা চাইতে দেখা যায় অভিযুক্ত কিশোরকে।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, শীতলক্ষ্যা নদীর কাঁচপুরের ওয়াকওয়ে দিয়ে স্কুল ড্রেস পড়া দুই ছাত্রী তানিসা আক্তার ও মিম আক্তার হেঁটে যাচ্ছিল। এসময় বখাটে এক কিশোর পেছন থেকে এক ছাত্রীকে লাথি মারে। মেয়েটি প্রতিবাদ করলে তাকে পেছন থেকে আবার উড়ন্ত লাথি মারে ছেলেটি। এসময় ওই কেউ একজন এটি মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করে। গত বৃহস্পতিবার ওই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। অভিযুক্ত সাড়ে ১১ বছর বয়সী দিলসাদ হোসেন কাঁচপুর রায়েরটেক এলাকার লিটন খানের বাড়ির ভাড়াটিয়া। তার বাবা সাফিউল ইসলাম পেশায় রিকশা চালক ও মা মোছাম্মদ দুলালী গার্মেন্টস কর্মী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় , গত প্রায় এক মাস আগে সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ ছাত্রী তানিসা আক্তার ও সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী মিম আক্তার কাঁচপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ের ওয়াকওয়ের পাশে হাঁটতে যায়। এসময় দিলশাদ হোসেন নামের এক কিশোর পেছন থেকে তানিসাকে পরপর দুইবার লাথি মারে। ছেলেটির সঙ্গে কেউ একজন সেটি মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ করে। গত বৃহস্পতিবার সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও টিকটকে ছড়িয়ে দিলে সেটি বৃহস্পতিবার থেকে ভাইরাল হয়ে যায়।
সূত্র জানায়, ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস ওয়ান থেকে শুরু করে দশম শ্রেণী পর্যন্ত পাঠদান করনো হয়। ওই স্কুলে বর্তমানে এডহক কমিটিতে বিএনপি নেতা মোঃ মহিউদ্দিন মিয়া সভাপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, সদস্য সচিব স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন সরকার, অভিভাবক প্রতিনিধি মোঃ মমিনুল ইসলাম, শিক্ষক প্রতিনিধি মোঃ মনোয়ার হোসেন।
তাদের দাবি, তারা ওই ছাত্রীদের টিসি দেননি। দীর্ঘদিন ধরে স্কুল ফাঁকি দিয়ে দুই শিক্ষার্থী বাইরে অবস্থান করার কারণে তাদের তাদের অভিভাবকদের চিঠির মাধ্যমে সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় ফোনে তাদের ডেকেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাই চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়।
নির্যাতনের শিকার মেয়ে তানিসা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার কাঁচপুর ইউনিয়নের উত্তরপাড়া এলাকার শাহীন মিয়ার মেয়ে। সে কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের নিন্ম মাধ্যমিকের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। ওই স্কুল ছাত্রীর বাবা শাহীন মিয়া কাঁচপুরে স্কয়ার গার্মেন্টসে কাজ করেন। তার মা হাজেরা বেগম অসুস্থ।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টিকটকে দেওয়ার জন্যই ঘটনাটি ভিডিও করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় স্কুল ছাত্রীকে টিসি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না।
ভুক্তভোগী স্কুলছাত্রী তানিসা জানান, স্কুলের সপ্তম শ্রেণিতে পড়া এক বড় আপুর সঙ্গে ছুটির পর সে ওই ওয়াকওয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। ওই আপু একজনের বাসায় যাবেন বলে তাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। ওয়াকওয়েতে যাওয়ার সময় দিলসাদসহ তিন-চারজন কিশোর বসে ছিল। তাঁরা হেঁটে যাওয়ার সময় দিলসাদ তাকে লাথি মারে। সঙ্গে থাকা বড় আপু লাথি মারার কারণ জানতে চাইলে দিলসাদ গালিগালাজ করে। পরে সেখান থেকে সরে যাওয়ার সময় তাকে আবার লাথি মারা হয়। ঘটনাটি ভিডিও করা হলেও তাঁরা তখন কিছু বলেনি। তানিসা জানায়, পরে তাদের বিদ্যালয়ে ডেকে নিয়ে এ ঘটনায় বিচার করা হয়। সে দিলসাদকে আগে থেকেই চিনত বলেও জানায়।
তানিসার মা হাজেরা আক্তার বলেন, বিদ্যালয় থেকে তাঁকে জানানো হয়েছে, তাঁর মেয়ে ‘ভালো নয়’ এবং তাকে আর বিদ্যালয়ে রাখা হবে না। এমনকি বিদ্যালয়ে ঢুকতেও দেওয়া হবে না বলে তাদেরকে জানানো হয়েছে।
তার মেয়েকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তানিসার বাবা শাহীন আলম। তিনি বলেন, স্কুলের স্যাররাসহ অন্যরা তার মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করতে বলেছেন।
অভিযুক্ত কিশোরের মা মোছাম্মদ দুলালী দাবি করেন, বকা দেওয়ার কারণে তাঁর ছেলেকে ওই স্কুলছাত্রীকে মারধর করেছে। পরে এলাকার লোকজন তাঁর ছেলেকে মারধর করেছে এবং কান ধরে ওঠবস করিয়েছে। সে আর এমন কাজ করবে না বলে স্বীকার করেছে।
ওই স্কুল ছাত্রীর বাবা শাহীন আলম আরও জানান, তার মেয়েকে লাথি মারার ভাইরাল ভিডিওটি এক মাস আগের। তিনি বলেন, স্কুল চলাকালীন সময় স্কুলের বাইরে ঘোরাফেরার করায় স্কুলের স্যারেরা বিচার করে তার মেয়ে তানিসাকে টিসি দিয়ে বের করে দিয়েছে।
শাহীন মিয়া বলেন, আমরা গরীব মানুষ। কাজ কর্ম করে খাই। এখন এই স্কুলে পড়তে পারবো না। মেয়েকে অন্য স্কুলে ভর্তি করতে হবে।
সোনারগাঁও থানার পরিদর্শক ( তদন্ত) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ওই কিশোরকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে তার পরিবার এবং স্কুলছাত্রীর পরিবারকে থানায় বসা হয়েছিল। তিনি বলেন, স্কুলছাত্রীর পরিবার মামলা না করায় সমাজসেবা বিভাগের প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে।
কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন সরকার জানান, বিভিন্ন সময়ে দুই শিক্ষার্থী স্কুলে না এসে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। তবে দুই শিক্ষার্থীকে একাধিক বার মৌখিক সতর্ক করা হলেও তারা শোনেনি। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর দুই শিক্ষার্থীর পরিবারকে ভবিষ্যৎতে এমন করলে তাদের টিসি দেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। তবে তাদের বহিষ্কার করা হয়নি। তবে ঘটনাটি স্কুলের বাইরে তাই স্থানীয় লোকজন ছেলে ও ছাত্রীদের বিচার করেছে শুনেছি।
তিনি আরো বলেন, ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় স্কুলের সুনাম ক্ষুন্ন হওয়া ও উৎশৃঙ্খল আচরণের কারণে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি, এলাকাবাসী আমরা সবাই বসে ছাত্রীর পরিবারকে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। টিসির দেওয়ার বিষয়ে পরিবারের দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদেরকে চাপে রাখতে এটা বলা হয়েছিল। এ বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ, এলাকার লোকজন বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, তারা যদি বলে ডেকে বলে সেটাই তো হবে। আমি তো একা কিছু করছি না। তিনি বলেন, বার বার একটি মেয়ে আমাদের স্কুলের বদনাম করতেছে-এজন্য কথা বলা, শাসন করা। সে ড্রেসটা পড়ে না গেলে আমাদের তো সমস্যা ছিল না। সবই তো বুঝতাছেন আপনারা সবাই থেকে একটা মিল মিশ করে দিয়েন। ইউএনও স্যার তাদেরকে ডেকেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
কাঁচপুর ওমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির এডহক কমিটির সভাপতি মোঃ মহিউদ্দিন মিয়া জানান, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য তাদের অভিভাবকদের চিঠি দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন শৃঙ্খলা পরিপন্থী কাজ করলে তাদের স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হবে।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আতিকুর রহমান বলেন, প্রতিষ্ঠান থেকে তাকে কিছু জানানো হয়নি। বিষয়টি তিনি শুনেছেন। তিনি বলেন, স্কুল ছাত্রীকে লাথি মেরেছে একটি কিশোর। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে দুই স্কুল ছাত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি নিজে স্কুলে গিয়ে খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি। এ ঘটনায় স্কুল কর্তৃপক্ষের কোন গাফিলতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সমাজ সেবা বিভাগের প্রবেশন অফিসার নূর ফারজানা জানান, স্কুল ছাত্রীকে লাথি দিয়ে ভাইরাল কিশোরকে তার জিম্মায় বাবা মায়ের কাছে দেওয়া হয়েছে। আগামী ৬ মাস ওই কিশোরকে কাউন্সিলের মাধ্যমে ভালো পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। প্রমেশন অফিসারের কাছে বাবা মাসহ প্রতি মাসে দু’তিন বার হাজিরা দেবেন। এ কিশোরকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য সকল চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। উক্তত্যর শিকার মেয়ের ও তার পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।