ছাত্রজীবনের রাজনীতি, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে কর্মজীবনে শিক্ষকতা—এরপর সরকারি দায়িত্ব, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও পেশাগত পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিনে তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন মির্জা ফখরুল। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও ছাত্রজীবনেই নিজের রাজনৈতিক পথচলা শুরু করেন তিনি।
ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।
ছাত্রজীবনে রাজনীতির পাশাপাশি নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন মির্জা ফখরুল।
শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন তিনি। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
কর্মজীবনের একপর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গেও যুক্ত হন। তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
পরবর্তী সময়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরলেও ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন।
১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। তৃণমূলের রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন তিনি।
পরবর্তীতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন ও রাজনৈতিক অবস্থান গণমাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি বিএনপির অন্যতম পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল।
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব কমেনি। দলীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়।
২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান।
প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন।
এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। বিরোধী দলের রাজনীতির সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে।
২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।
এবার রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।












