বাবার মৃত্যুতে ফুটবল থেকে বিরতি, পরিবারের সঙ্গে মেসি

বাবা হোর্হে মেসিকে শেষ বিদায় জানানোর পরও যুক্তরাষ্ট্রে ফেরেননি আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি। জীবনের কঠিন এই সময়ে ফুটবল থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রেখে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

রোজারিওর কাছের ফুনেসের কেন্টাকি গেটেড কমিউনিটিতে স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো ও সন্তানদের সঙ্গে অবস্থান করছেন মেসি। বাবাকে হারানোর শোক সামলে পরিবারের পাশে থাকাকেই আপাতত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন ইন্টার মায়ামির এই তারকা।

শনিবার রাতে আর্জেন্টিনায় পৌঁছানোর পর মেসি সরাসরি যান রোজারিওর কাছের পেরেজ শহরের এল প্রাদো কবরস্থানে। সেখানেই পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে হোর্হে মেসির শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। পুরো আয়োজনটি ছিল অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয়। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে সেখানে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

ফোর্ট লডারডেল থেকে চার্টার বিমানে আর্জেন্টিনার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় মেসির সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী আন্তোনেলা ও তাদের সন্তানরা। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তারা সরাসরি কবরস্থানে যান। রাতভর সেখানে থাকার পর রোববার দুপুরের পর কবরস্থান ত্যাগ করেন মেসি।

মেসির বাবার শেষকৃত্যে পরিবারের পক্ষ থেকে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখা হয়। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা হওয়া সত্ত্বেও তার আগমন ও শেষকৃত্যের বিস্তারিত খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি।

কবরস্থানের বাইরে তেমন কোনো ভিড়ও ছিল না। তবে মেসির গাড়ি কবরস্থানে প্রবেশের সময় এক সমর্থক চিৎকার করে বলেন, ‘শক্ত থাকুন, লিও!’ কবরস্থানের পাশের ফটকেও একই বার্তা লেখা একটি ব্যানার দেখা যায়।

আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও জাতীয় দলের কোচিং স্টাফের পক্ষ থেকেও হোর্হে মেসির প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

রোববার বিকেলে মেসি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ফুনেসের কেন্টাকি এলাকায় ফিরে যান। সেখানে সাংবাদিকদের উপস্থিতি থাকলেও স্থানীয় বাসিন্দারা মেসি পরিবারের ব্যক্তিগত মুহূর্তকে সম্মান দেখিয়ে তাদের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেননি।

হোর্হে মেসি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তবে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খুব সীমিত তথ্যই প্রকাশ্যে এসেছে। পরিবারের পক্ষ থেকেও বিষয়টি সবসময় ব্যক্তিগত রাখা হয়েছে।

লিওনেল মেসির ফুটবল ক্যারিয়ারে হোর্হে মেসির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলা থেকেই ছেলের ফুটবল প্রতিভা বিকাশে তিনি পাশে ছিলেন।

মেসির শৈশবের ক্লাব আবানদেরাদো গ্রান্দোলিতে তার ফুটবলজীবনের শুরুর সময় থেকে হোর্হে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজে মেসির বেড়ে ওঠার সময়ও তিনি ছেলের পাশে ছিলেন। এরপর বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে মেসির উত্থানের পুরো পথেই বাবাকে অন্যতম প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে পেয়েছেন তিনি।

বাবার সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা মেসি বিভিন্ন সময় প্রকাশ করেছেন। ২০০৮ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে গোল করার পর বাবাকে উৎসর্গ করে ‘আই লাভ ইউ, ড্যাড’ লেখা জার্সি পরেছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা।

হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর শোক প্রকাশ করেছে ফুটবল বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাব ও সংগঠন। আর্জেন্টিনার একাধিক ক্লাবের পাশাপাশি বিদেশের ক্লাবগুলোও মেসি পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে।

রিয়াল মাদ্রিদসহ বিভিন্ন ক্লাব শোকবার্তা পাঠিয়েছে। হোর্হে মেসির প্রিয় দল নিউয়েলস ওল্ড বয়েজও ম্যাচের আগে তার স্মরণে ব্যানার প্রদর্শন করে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।

মেসির জাতীয় দলের সতীর্থরাও তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। লিয়ান্দ্রো পারেদেস জানিয়েছিলেন, বিশ্বকাপজয়ী দলের বেশ কয়েকজন সদস্য মেসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং রোজারিওতে গিয়ে তাকে সমর্থন জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তবে পরিবারের গোপনীয়তার কারণে সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

বাবার মৃত্যুর কারণে মেসির মাঠে ফেরার সময়ও এখনো নিশ্চিত নয়। বুধবার লিগস কাপে মেক্সিকোর ক্লাব লেওনের বিপক্ষে ইন্টার মায়ামির ম্যাচ রয়েছে। ওই ম্যাচে তার খেলার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তার উপস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ ছাড়া শনিবার ন্যাশভিলের বিপক্ষে এমএলএস ম্যাচেও মেসি খেলবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

বাবাকে হারানোর পর আপাতত ফুটবলের চেয়ে পরিবারকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন মেসি। যে মানুষটি ছোটবেলা থেকে তার ফুটবলস্বপ্নের পাশে ছিলেন, পরামর্শ দিয়েছেন এবং ক্যারিয়ারের কঠিন সময়গুলোতে পথ দেখিয়েছেন—সেই বাবাকে হারানোর শোক সামলাতে মাঠ থেকে দূরে থাকাটাই এখন মেসির কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *