অভাবকে জয় করে মিথিলার সাফল্য

 

সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সংসারে অভাব যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। বাবা-মাকে মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগাতে গিয়ে অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়েছে। নামী দামি কোচিং সেন্টারে পড়া কিংবা গৃহশিক্ষকের সহায়তা নেওয়ার সুযোগও হয়নি। তবে এসব বাধা দমিয়ে রাখতে পারেনি মিথিলা আক্তার পুষ্পকে। নিজের চেষ্টা, নিয়মিত পড়াশোনা আর শিক্ষকদের সহযোগিতায় এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। এখন তার স্বপ্ন, ভবিষ্যতে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হওয়া।

মিথিলা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের বাহাউল হক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী। তার বাবা ইয়ায়ুল ইসলাম পেশায় গার্মেন্টের নিরাপত্তাকর্মী। মা লাইলী আক্তার কাজ করেন একটি পোশাক কারখানায়। তারা সোনারগাঁও পৌরসভার গোয়ালদী খানবাজার এলাকায় আবদুর রহমানের বাড়িতে ভাড়া থাকেন। তাঁদের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার বড়গাংদিয়া গ্রামে।
মিথিলার মা জানায়, সংসারে টানাপোড়েন থাকলেও মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি তাঁরা। সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর মেয়ের পড়াশোনার ব্যয় জোগাড় করা ছিল কঠিন। অনেক সময় স্কুলের মাসিক বেতন পরিশোধ করতেও বাবাকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তাই কোচিং কিংবা ব্যক্তিগত শিক্ষকের কাছে পড়ার সুযোগ হয়নি মিথিলার।

তবে নিজের পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি সে। বাড়িতে নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় বুঝতে অসুবিধা হলে শিক্ষকদের কাছে গিয়ে জেনে নিয়েছে। তার আগ্রহ ও আন্তরিকতা দেখে শিক্ষকেরাও তাকে সহযোগিতা করেছেন।

ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়াও তার নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। মনোযোগ দিয়ে ক্লাসের পড়া লিখে নিয়েছে। অনেক সময় হেঁটেই বাড়ি ফিরেছে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির তুলনামূলক কঠিন পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সংকটও সামলাতে হয়েছে তাকে। শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফলে মিলেছে সেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি।

বাহাউল হক টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের শিক্ষিকা শারমিন আক্তার বলেন, মিথিলা অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও নিয়মিত শিক্ষার্থী ছিল। পড়ালেখার প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়। শিষ্টাচারের কারণে শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছেও সে প্রিয় ছিল।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ লায়লা আফরোজ বলেন, ক্লাসে মনোযোগী হওয়া এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চললে ভালো ফল করা সম্ভব। মিথিলা তার একটি ভালো উদাহরণ। তার সাফল্যে আমরা আনন্দিত। আমরা তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।
জিপিএ-৫ পাওয়ার পর মিথিলার বাবা-মায়ের মুখে এখন আনন্দের ছাপ। আনন্দের পাশাপাশি দুশ্চিন্তা তাদের আঁকড়ে ধরেছে। সাফল্য ছুঁতে আগামী দিনগুলোতে তার পড়াশোনার খরচ মেটাবেন কিভাবে সেই চিন্তা তাদের মাথায় ভাঁজ।

মিথিলার স্বপ্ন, ভবিষ্যতে একজন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হবে। নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পাশাপাশি দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করতে চায় মিথিলা।

মিথিলা জানায়, তার বাবা-মা অনেক কষ্ট করে তাকে পড়াশোনা করিয়েছেন। ভবিষ্যতে সফল হয়ে তাঁদের এ ত্যাগের প্রতিদান দিতে চায়।

তবে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়ার পরও মিথিলার সামনে নতুন দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চশিক্ষার খরচ। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় পরবর্তী পড়াশোনা কীভাবে চালিয়ে যাবে, তা নিয়ে চিন্তিত সে।
মিথিলা আরো জানায়, তার পরিবারের পক্ষে উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করা কঠিন। সরকারী বেসরকারি সংস্থা তার পড়াশোনার খরচ বহনে সহযোগিতা করে, তাহলে সে তার স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এগিয়ে যেতে পারব।
অভাবের সঙ্গে লড়াই করে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া মিথিলার সামনে এখন উচ্চশিক্ষার নতুন পথ। পথটি হয়তো আরও কঠিন। তবে অধ্যবসায় ও স্বপ্নকে সঙ্গী করে সেই পথ পাড়ি দিতে চায় সে। একদিন সফটওয়্যার প্রকৌশলী হয়ে পরিবার ও দেশের জন্য কিছু করার স্বপ্ন দেখছে মিথিলা।

Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *