কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। সোমবার সকালে আঘাত হানা ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১১১ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন আরও ৮৭ জন। ধসে পড়া শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে ও কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার পৌরসভার কাছে। ভূমিকম্পটির গভীরতা ছিল প্রায় ১০৭ কিলোমিটার।
রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হলেও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী কম্পন অনুভূত হয়। প্রতিবেশী ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামার কিছু এলাকাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে
ভয়াবহ এই পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। মাত্র কয়েক দিন আগে দায়িত্ব নেওয়া নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এস্পরিয়েলার জন্য এটি বড় ধরনের মানবিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রেসিডেন্ট জানান, মানুষের জীবন রক্ষা, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রের সব ধরনের সক্ষমতা কাজে লাগানো হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের জীবিত উদ্ধার করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার কফি উৎপাদনকারী অঞ্চলসহ বেশ কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
রিজারালদা: কফি বেল্ট হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। পেরেইরা শহরেও বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। বেশ কিছু বাড়িঘর ও পুরোনো ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ভ্যালে দেল কাউকা ও ক্যালি: এই অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ক্যালিতে বেশ কয়েকটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার কথা জানানো হয়েছে। উদ্ধারকারী দল ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছে।
মানিজালেস: শহরটিতে প্রাণহানির পাশাপাশি ঐতিহাসিক কিছু স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি ঐতিহ্যবাহী গির্জার টাওয়ারে আংশিক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
মেডেলিন: ভূমিকম্পের পর আতঙ্কিত বাসিন্দাদের অনেকেই নিরাপত্তার জন্য ভবন ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন। পরিস্থিতির কারণে মেট্রো রেল পরিষেবাও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
বোগোতা: রাজধানীতে বড় ধরনের কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। বরং রাজধানীর উদ্ধারকারী দলগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর কয়েকটি বিমানবন্দর সাধারণ যাত্রীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। জরুরি চিকিৎসা ও ত্রাণবাহী বিমান চলাচলের জন্য সেগুলো সীমিতভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভূমিকম্পের পর কলম্বিয়ার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে কয়েকটি দেশ। এল সালভাদর উদ্ধারকারী দল ও চিকিৎসক পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। ইকুয়েডর বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্ধারকর্মী, কুকুর ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পাঠানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। মেক্সিকোও প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।
জাতিসংঘও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে সহায়তার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগে নিজের দেশের মানুষের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বার্তায় তিনি ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে কঠিন সময়ে সবাইকে একে অপরের পাশে থাকার আহ্বান জানান।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কারণে কলম্বিয়া ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর একটি। অতীতেও দেশটিতে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এবারের ভূমিকম্পের পরও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কা থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। উদ্ধারকারী দলগুলো এখন ধসে পড়া ভবনের নিচে জীবিতদের সন্ধান এবং আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।











