যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা নতুন করে অচলাবস্থায় পড়ার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোতে হামলার ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব এল-মানদেব প্রণালী এবং ওমান উপসাগরে পৃথক নৌযানে হামলার খবর পাওয়া যায়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এসব জলপথে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার প্রভাব ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে পড়তে শুরু করেছে। তেলের দাম বেড়েছে এবং বিভিন্ন শেয়ারবাজারে দরপতন দেখা দিয়েছে।
ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় ও কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে বাব এল-মানদেব প্রণালীতে মিসরীয় মালিকানাধীন ‘তিহামাহ’ নামের একটি ছোট পণ্যবাহী জাহাজে সন্দেহভাজন হুথি হামলা হয়েছে।
হামলায় জাহাজটির চারজন নাবিক নিহত হন। তাদের উদ্ধারে যাওয়া হুথিবিরোধী সামরিক গোষ্ঠীর আরও দুই সদস্যও প্রাণ হারান।
চলমান সংঘাত শুরু হওয়ার পর ইয়েমেনের হুথিদের হামলায় কোনো নৌযানে প্রাণহানির এটিই প্রথম ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুথি পরিচালিত সংবাদ সংস্থা সাবার দাবি, সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ঘোষিত নৌ অবরোধের অংশ হিসেবে সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী একটি সৌদি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ওমান উপসাগরেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোর নৌ অবরোধ লঙ্ঘনের অভিযোগে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজের ওপর মার্কিন নৌবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে।
হামলায় জাহাজটির স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে।
ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন তেহরানের শর্ত মেনে না নিলে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে।
ইরানের পক্ষ থেকে জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা এবং গাজা, লেবাননসহ পুরো অঞ্চলে সংঘাত বন্ধের বিষয়কে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে সামনে রাখা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই জলপথ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংঘাত বন্ধের বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চুক্তি ও আলোচনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালী এখন পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে এবং ইরান আর মধ্যপ্রাচ্যে আগের মতো প্রভাবশালী অবস্থানে নেই।
তবে একই সঙ্গে তিনি তেহরানের ওপর আরও কঠোর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের হুমকিও দিয়েছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসির কর্মকর্তারা যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করার বার্তা দিয়েছেন।
আইআরজিসির উপদেষ্টা মোহাম্মদ রেজা নাকদি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছেন, তাদের বাহিনী প্রয়োজনে শত্রুর ভূখণ্ডে গিয়ে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করছে।
এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৯১ ডলারে উঠেছে। একই সময়ে মার্কিন অপরিশোধিত তেলের দাম ১ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ৮৩ দশমিক ২০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথগুলোতে অবরোধ বা হামলা অব্যাহত থাকলে তেলের সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে খাদ্য, শিল্প উৎপাদন ও বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
লোহিত সাগর, বাব এল-মানদেব, ওমান উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী—সবগুলোই বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এসব এলাকায় সামরিক সংঘাত বাড়লে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সৌদি আরব, ইয়েমেন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তিকেও আরও গভীরভাবে জড়িয়ে ফেলতে পারে।
আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা থাকলেও সাম্প্রতিক নৌযানে হামলা, হরমুজ বন্ধ রাখার হুঁশিয়ারি এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। এখন আন্তর্জাতিক মহলের নজর কূটনৈতিক আলোচনা আবার গতি পায় কি না এবং কৌশলগত জলপথগুলোতে উত্তেজনা কমে কি না—সেদিকে।












