ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জেনারেল মোহাম্মদ রেজা নাকদি বলেছেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্তও চালিয়ে যেতে প্রস্তুত তেহরান। ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদ ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি শেষ হওয়ার কথা।
পিবিএসকে দেওয়া এক বিরল সাক্ষাৎকারে নাকদি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধকে ইরান নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। তার দাবি, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ইরানের সামরিক বাহিনী তত বেশি অভিজ্ঞতা অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দেশ যেন ইরানে হামলার সাহস না পায়, সেই সক্ষমতা তৈরি হবে।
নাকদির ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের লক্ষ্য শুধু যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নয়; বরং সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হামলাকারীদের কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়া—ইরানে আক্রমণ চালালে তার জন্য বড় মূল্য দিতে হবে।
নাকদিকে প্রশ্ন করা হয়, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া কি ইরানের কৌশল? জবাবে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করাই তাদের মূল লক্ষ্য নয়। বরং এমন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করাই উদ্দেশ্য, যাতে ভবিষ্যতে কোনো শত্রু রাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা ইরানের আগে খুব সীমিত ছিল। কিন্তু গত কয়েক মাসের সংঘাতে ইরানের বাহিনী সেই অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতকে তিনি সামরিক সক্ষমতা ও কৌশল আরও উন্নত করার একটি ক্ষেত্র হিসেবেও দেখছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যৌথ হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশ নিহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
এরপর পাল্টা জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। সংঘাতের প্রভাবে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
সাক্ষাৎকারে নাকদির কাছে জানতে চাওয়া হয়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বিরুদ্ধে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে তেহরানের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে।
জবাবে তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন পদক্ষেপ নেওয়া বড় ধরনের ভুল হতে পারে। তার দাবি, ইরানে পরমাণু হামলা হলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।
তবে ইরান নিজে পরমাণু অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে নাকদি তা নাকচ করেন। তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু বোমার প্রয়োজন নেই এবং গণহত্যারও প্রয়োজন নেই।
ইরানে প্রচলিত ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান নিয়েও কথা বলেন আইআরজিসির এই কর্মকর্তা। তার দাবি, এই স্লোগান যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের বিরুদ্ধে নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দেশটির পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতাকে বোঝাতেই এ ধরনের স্লোগান ব্যবহার করা হয়।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা নিয়েও বক্তব্য দেন নাকদি। তিনি দাবি করেন, ইরানের শক্তি শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল নয়; এর মূল ভিত্তি হলো দেশটির বিশ্বাস, প্রতিরোধের মানসিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ের সক্ষমতা।
তিনি আরও দাবি করেন, ইরান প্রতিদিন যতসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিদিন ব্যবহার করে না। তবে কোথায় বা কীভাবে এসব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি।
নাকদির ভাষ্য, যুদ্ধ কয়েক বছর ধরে চললেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এমনকি কোনো এক পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে গেলেও ইরান আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এদিকে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি বলে জানা গেছে।
রয়টার্সের কাছে এক ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জুনে হওয়া অন্তর্বর্তী সমঝোতা পুনরুজ্জীবিত করা এবং সেটি বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণের বিষয়ে এখনো কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এর আগে গত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ১৪ দফা একটি সমঝোতা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই সমঝোতায় অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ এবং ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার জন্য আলোচনা চালানোর কথা ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে ৮ জুলাই ট্রাম্প ওই চুক্তিকে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেন। এর এক সপ্তাহ পর ইরানও সমঝোতা স্মারক স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তোলে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি। অন্যদিকে ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ প্রত্যাহার এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্ত করার মতো নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি।
ফলে যুদ্ধবিরতি ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা এখনো বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এরই মধ্যে ইরানের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার হুমকি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।












