ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিশ্ব ফুটবলে আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপসহ প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ চালুর বিতর্কিত পরিকল্পনা ঘোষণা এবং পরে তা প্রত্যাহারের পর থেকেই তোপের মুখে রয়েছেন ৫৬ বছর বয়সী এই ক্রীড়া প্রশাসক।
সোমবার ইউরোপের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন—এএফসি—একটি যৌথ চিঠি দিয়েছে। এতে ইনফান্তিনোর ওপর চাপ আরও বহুগুণ বেড়েছে।
যৌথ চিঠিতে তিন কনফেডারেশন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ফুটবল কারও একক সম্পত্তি নয় এবং ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জায়গাও নয়। ইনফান্তিনোর সমর্থক গোষ্ঠী সমর্থন প্রত্যাহারের বিরুদ্ধে পাল্টা বিবৃতি দিলেও তাঁর সমালোচকরা অবস্থান থেকে সরে আসেননি।
উয়েফা, এএফসি ও কনকাকাফের যৌথ চিঠিতে বলা হয়েছে, ফুটবলের নেতৃত্ব কোনো ব্যক্তিগত মালিকানা নয়। এটি ক্ষমতা আঁকড়ে ধরা বা ক্ষমতার দাবি জানানোর বিষয়ও নয়। তাদের দাবি, বিশ্বাস ভঙ্গ হলে এবং কোনো ব্যক্তি তাকে যারা ক্ষমতা দিয়েছে সেই সমষ্টির ঊর্ধ্বে নিজেকে স্থান দিলে সে তার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়।
তিন কনফেডারেশন ফিফার বেসরকারি বিনিয়োগ প্রস্তাবের পুরো প্রক্রিয়ার ওপর পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে ফুটবলের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে তারা এমন নেতৃত্বের আহ্বান জানিয়েছে, যা ফুটবলকে সেবা করবে, শাসন করার চেষ্টা করবে না।
সম্প্রতি মরক্কোতে অনুষ্ঠিত ফিফার একটি জরুরি বৈঠক নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছে তিন কনফেডারেশন। বৈঠকে নির্বাচিত মাত্র একজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন দাবি করে তারা জানতে চেয়েছে, কীভাবে এমন গুরুতর বিচারবুদ্ধির ব্যর্থতা ঘটল। এ বিষয়ে ফিফার কোনো ভূমিকা থাকবে না—এমন একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানিয়েছে তারা।
এর আগে গত শুক্রবার নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভনেস সরাসরি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে অবিলম্বে ফিফা সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। দীর্ঘদিন ধরেই ইনফান্তিনোর সোচ্চার সমালোচক হিসেবে পরিচিত ক্লাভনেসকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবেও দেখছেন অনেকে।
এর আগে গত শনিবার ফিফার এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ফিফা ও সভাপতি ইনফান্তিনোকে দুর্বল করার জন্য একটি সংগঠিত ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চলছে। নিজের সমর্থন ধরে রাখতে ইনফান্তিনো ইতোমধ্যে ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।
আফ্রিকার ফুটবল কনফেডারেশনের পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর, বলিভিয়া এবং কনকাকাফের সদস্য মেক্সিকোর মতো দেশগুলোও ইনফান্তিনোর পাশে রয়েছে।
ফিফা আরও অভিযোগ করেছে, উয়েফায় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ইনফান্তিনোর দায়িত্ব পালনের সময় এক সাবেক কর্মচারীকে অর্থ প্রদান সংক্রান্ত কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে। ফিফা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
বর্তমানে ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যে প্রায় ৭০টি প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা ইনফান্তিনোর পক্ষেই ভোট দেবে। অন্যদিকে, ডজনখানেক দেশ আগে দেওয়া সমর্থন প্রত্যাহার করেছে অথবা জানিয়েছে, তারা ইনফান্তিনোকে ভোট দেবে না।
তবে উয়েফাসহ ইনফান্তিনোর ওপর আস্থা হারানোর কথা বলা কনফেডারেশনগুলোর অবস্থানও পুরোপুরি এক নয়। এশিয়ার একাধিক দেশ এবং কনকাকাফভুক্ত মেক্সিকো এখনো ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ধরে রেখেছে।
সব মিলিয়ে, বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্ককে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এই বিভাজন ফিফার ইতিহাসে বড় ধরনের প্রশাসনিক সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন—বিশ্ব ফুটবলের নেতৃত্বে ইনফান্তিনোই থাকবেন, নাকি তাঁর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই চাপ শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব পরিবর্তনের পথ তৈরি করবে?
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও রয়টার্স