সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি:
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গতি সীমাসহ ট্রাফিক আইন ভাঙলেই অটো ফাইন করা হবে। এখন থেকে মহাসড়কে নির্ধারিত গতি সীমা অতিক্রম, উল্টো পথে চলাচল, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংসহ ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হাইওয়ে পুলিশ একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত মহাসড়ককে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনতে ইতোমধ্যে ৪৯০টি এআই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগষ্ট) দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার মেঘনাঘাটে হাইওয়ে পুলিশ কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল মনিটরিং সেন্টারে আধুনিক এআই ক্যামেরাভিত্তিক ‘অটো ফাইন সিস্টেম’-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ সব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, কেউ নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করলে, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে, উল্টো পথে চলাচল করলে কিংবা নিষিদ্ধ স্থানে ওভারটেকিং করলে ক্যামেরা তা শনাক্ত করবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানা আরোপ করা হবে।
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি ফারুক আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন ফেডারেশনের সভাপতি ও সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, পুলিশের আইজিপি আলী হোসেন ফকির, নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হান কবিরসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।
মহাসড়কের অনিয়ম প্রসঙ্গে মন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ট্রাফিক অনিয়মের পাশাপাশি সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব হবে। মালিকপক্ষ, শ্রমিক ফেডারেশন কিংবা পুলিশের পক্ষ থেকে যেখান থেকেই চাঁদাবাজি হোক না কেন, তা এখন সিসিটিভি ক্যামেরায় রেকর্ড হবে। প্রযুক্তির এই নজরদারির ফলে অপরাধের প্রবণতা বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় মহাসড়ককে পুরোপুরি চাঁদাবাজিমুক্ত করা সম্ভব হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
মন্ত্রী বলেন, জরিমানার তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিআরটিএর ডাটাবেজে চলে যাবে। এরপর গাড়ির নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠানো হবে। মালিক অনলাইনে বা মোবাইলের মাধ্যমে সহজেই জরিমানার অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। বারবার আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি বিআরটিএর বিদ্যমান আইন অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।
তিনি বলেন, নতুন এ ব্যবস্থা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ পুলিশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হবে। এতে সড়কে আইন মানার প্রবণতা বাড়বে এবং দুর্ঘটনা কমবে বলে সরকার আশা করছে।
হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেইট পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কিলোমিটার সড়কে এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। মহাসড়কের উভয় পাশে স্থাপন করা হয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি সিসিটিভি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের গতিবিধি ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ক্যামেরায় তা শনাক্ত হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সোনারগাঁয়ের মেঘনাঘাটে স্থাপন করা হয়েছে মূল ডাটা সেন্টার। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপারের কার্যালয়, কাঁচপুর হাইওয়ে থানা, দাউদকান্দি হাইওয়ে থানা ও বারআউলিয়া হাইওয়ে থানায় মনিটরিং সেন্টার রাখা হয়েছে। ফলে মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে সংঘটিত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
হাইওয়ে পুলিশের এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হয়েছে ‘হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায়। সিসিটিভি সার্ভিলেন্স সিস্টেম স্থাপনের কাজ করেছে স্মার্ট টেকনোলজিস (বিডি) লিমিটেড। ২০২১ সালের ২৩ জুন শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৫ সালের ৩০ জুন শেষ হয় এবং একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর তা হস্তান্তর করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অটো ফাইন সিস্টেম চালুর ফলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগে পুলিশের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমবে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়বে। জরিমানার অর্থ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধের সুযোগ থাকায় জরিমানা আদায়েও দ্রুততা আসবে। একই সঙ্গে ট্রাফিক আইন মেনে চলার প্রবণতা বাড়লে মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমার পাশাপাশি যান চলাচলে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। মহাসড়কের পাশে থাকা হাট-বাজার, শিল্পকারখানা, পেট্রোলপাম্প ও সিএনজি স্টেশন, বাসস্টপেজ ও বাসস্ট্যান্ডের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ফিডার রোড মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এছাড়া স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও ক্লিনিক থাকায় বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের চাপ তৈরি হয়। পথচারী পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ, ওভারপাস ও আন্ডারপাস না থাকা এবং থাকা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারে অনীহাও মহাসড়কের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে থ্রি-হুইলারের চলাচলও যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বাড়তি চাপ তৈরি করে। এ অবস্থায় প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় অটো ফাইন সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে হাইওয়ে পুলিশ।












