রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর বিবরণ। জবানবন্দি অনুযায়ী, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রথমে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর একে একে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ও ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করা হয়।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে আদালতের বিশ্বস্ত সূত্র, তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থা ও পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাতে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস পাশের বাসার ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর দোতলা বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখানে পানির ট্যাংকের পাশে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন।
একপর্যায়ে ভোর হয়ে গেলে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের মাদক সেবনে বাধা দেন। এ সময় দুজনের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি হয়। পরে গণপতির সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ ছাদের এক কোণে রেখে টিন দিয়ে ঢেকে দেন তারা।
গণপতির সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও চিৎকারের শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী ছাদে উঠে আসেন।
আসামিদের জবানবন্দি অনুযায়ী, এ সময় মুগ্ধ দাস গামছা দিয়ে প্রীতিলতা চক্রবর্তীর গলায় পেঁচিয়ে ধরেন। অন্যদিকে সিদ্ধার্থ দাস আগামী চক্রবর্তীর গলা ও মুখ চেপে ধরেন।
পরে দুজন মিলে গামছা ও রশি ব্যবহার করে আগামী চক্রবর্তীকেও শ্বাসরোধ করেন। জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার মৃত্যু হতে প্রায় চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। পরে মা ও মেয়ের মরদেহ সিঁড়ির কাছে সরিয়ে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সেগুলো দেখা না যায়।
এরপর আসামিরা নিচতলায় নেমে আসেন। সেখানে তারা ১২ বছর বয়সী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে থাকতে দেখেন। প্রিয়ম তাদের একজনকে চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ রয়েছে।
আসামিদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশচাপা দিয়ে শিশুটিকে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে সিসি ক্যামেরা থাকার সন্দেহে নিচতলায় নেমে বৈদ্যুতিক মিটারের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন সিদ্ধার্থ। এরপর দুজনই ক্লান্ত হয়ে ওই বাড়িতে গোসল করেন এবং আরও এক পিস ইয়াবা সেবন করেন। এ সময় তারা খেজুর ও শসাও খান বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে আসামিরা পরে বাড়িতে ডাকাতির ঘটনা সাজানোর চেষ্টা করেন। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করে তারা এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেন, যাতে ঘটনাটি ডাকাতি মনে হয়।
পরে বাড়িতে থাকা কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা নিয়ে জুমার নামাজের সময় ছাদ দিয়ে বেরিয়ে যান তারা। সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ হাজার টাকা মুগ্ধ দাস নেন।
অন্যদিকে সন্ধ্যার দিকে সিদ্ধার্থ দাস প্রতিবেশী পূর্ণিমা কাকির বাড়ির পাশে কিছু স্বর্ণ মাটিতে পুঁতে রাখেন। পেশায় স্বর্ণ কারিগর সিদ্ধার্থ ওই স্বর্ণালংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করেছিলেন বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
গত শনিবার রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাসা থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
ঘটনার পর রোববার ভোরে মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মুগ্ধ নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে এবং সিদ্ধার্থ একই এলাকার বিনয়চন্দ্র দাসের ছেলে।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (ডিআইজি) আবদুল মাবুদ জানান, বাসার ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করেই শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
পরবর্তীতে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তারা ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। সেই জবানবন্দি ও তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য থেকেই হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত চিত্র সামনে এসেছে।
গণপতি চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান। নগরীর বাংলাদেশ ব্যাংক মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাসের পর মাছুয়াপাড়া এলাকায় জমি কিনে নিজস্ব বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন। দোতলা বাড়িটির নিচতলার কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও প্রায় দুই থেকে তিন বছর ধরে তিনি পরিবার নিয়ে দোতলায় বসবাস করছিলেন।
অবসরের পর তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক হিসেবেও রোগী দেখতেন।
ময়নাতদন্ত শেষে গত রোববার বিকেলে চারজনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর দখিগঞ্জ শ্মশানে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এখন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পাশাপাশি অন্যান্য আলামত, সাক্ষ্য ও তদন্তের তথ্য যাচাই-বাছাই করে মামলার পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।












