টলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা টোটা রায়চৌধুরী বর্তমানে একাধিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অভিনয়ের পাশাপাশি ফেলুদা চরিত্রের প্রস্তুতি নিয়েও ব্যস্ত এই অভিনেতা। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিজীবনের নানা বিষয় নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে টোটা জানান, হলিউডের একটি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। চরিত্রটি তার পছন্দও হয়েছিল। কিন্তু সিনেমাটিতে একটি ঘনিষ্ঠ দৃশ্য থাকায় শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন অভিনেতা।
টোটা বলেন, হলিউডের ধাঁচের ওই দৃশ্যে অভিনয় করতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেননি। তাই নির্মাতাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, দৃশ্যটি বাদ দেওয়া হলে তিনি সিনেমাটিতে কাজ করবেন। অন্যথায় তাকে বাদ দিতে হবে।
ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় না করার সিদ্ধান্তের পেছনে স্ত্রী শর্মিলি রায়চৌধুরীর পছন্দ-অপছন্দও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান টোটা। তার স্ত্রী এ ধরনের দৃশ্য পছন্দ করেন না। তাই পেশাগত জীবনে অনেক কিছু করা সম্ভব হলেও এমন কোনো কাজ করতে চান না, যা তার স্ত্রীকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়।
নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও বরাবরই সচেতন টোটা। তার মতে, অভিনয় দর্শকের সামনে তুলে ধরবেন তিনি, কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন ব্যক্তিগতই রাখতে চান। এমনকি শুটিং সেটে স্ত্রীকে না আসার বিষয়েও আগে থেকেই দুজনের মধ্যে কথা হয়েছিল। টোটার ভাষ্য, স্ত্রী সেটে থাকলে অভিনয়ের বদলে তার দিকেই মন চলে যেতে পারে।
সাক্ষাৎকারে ক্যারিয়ারের কঠিন সময়ের কথাও স্মরণ করেন টোটা। একসময় দীর্ঘদিন তেমন কাজ পাননি তিনি। তবে সেই সময়কে এখনো নিজের অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখেন। তার মতে, জীবনে খারাপ সময়ের পর ভালো সময় আসে। অতীতের ব্যর্থতা তাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে এবং কঠিন সময় পার করার অভিজ্ঞতাই বর্তমানের সাফল্যকে আরও বেশি মূল্য দিতে শিখিয়েছে।
একসময় যারা তার সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন না, এখন তারাই যোগাযোগ করেন—এ বিষয়েও কোনো আক্ষেপ নেই টোটার। তিনি মনে করেন, অভিনয় একটি পেশাগত জায়গা। যখন যার প্রয়োজন হবে, তখন সে যোগাযোগ করবে। এসব নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে মন খারাপ করার কোনো কারণ নেই।
পারিবারিকভাবে গয়নার ব্যবসা থাকলেও সেই পথে হাঁটেননি টোটা। পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের বড় ছেলে হওয়ায় ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। তবে অভিনেশনের প্রতি ভালোবাসা থেকেই শেষ পর্যন্ত অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি। বাবার পরামর্শ ছিল, একই সঙ্গে দুই পথে না গিয়ে একটি পেশায় পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া। সেই পরামর্শ মেনেই অভিনয়ে মন দেন টোটা। ১৯৯৬ সালের ১ জানুয়ারি পেশাদার অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি।
অভিনয়জীবনে ফেলুদা চরিত্রটি টোটার ক্যারিয়ারে বড় পরিবর্তন আনে। সৃজিত মুখোপাধ্যায় তাকে ফেলুদা হিসেবে বেছে নেওয়ার পর দর্শকের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা নতুন মাত্রা পায়। এরপর ‘শ্রীময়ী’ ও ‘রকি অউর রানি কি প্রেম কাহানি’র মতো কাজের মাধ্যমে আরও পরিচিতি পান তিনি। হিন্দি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন এই অভিনেতা।
তবে হিন্দি সিনেমায় বেছে বেছে কাজ করতে চান টোটা। একই ধরনের চরিত্রে বারবার অভিনয় করতে আগ্রহী নন তিনি। ভিন্নধর্মী ও ভালো চরিত্র পেলেই কাজ করতে চান। ‘ব্ল্যাক ওয়ারেন্ট’-এর মতো কাজও সেই কারণেই বেছে নিয়েছেন বলে জানান।
বাংলা সিনেমা নিয়েও নিজের মতামত জানিয়েছেন টোটা। তার মতে, টলিউডের সবচেয়ে বড় শক্তি গল্প বলার ক্ষমতা। বড় বাজেটের চেয়ে ভালো গল্প ও দক্ষ নির্মাতাদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সত্যজিৎ রায় ও তপন সিনহার মতো নির্মাতারা সৃষ্টিশীলতার টানেই চলচ্চিত্রে এসেছিলেন উল্লেখ করে টোটা মনে করেন, সেই গল্প বলার আগ্রহ ও প্যাশন আবার ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।
মেয়ের অভিনয়ে আসার কোনো আগ্রহ নেই বলেও জানান টোটা। তার মেয়ে প্রযুক্তিগত বিষয়ে পড়াশোনা করছেন এবং বর্তমানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে উচ্চশিক্ষা নিচ্ছেন।
নতুন প্রজন্ম নিয়েও আশাবাদী এই অভিনেতা। তার মতে, বর্তমান প্রজন্ম নিজেদের জীবন নিজেদের মতো করে সাজাতে চায়। প্রচলিত সামাজিক নিয়মের পরিবর্তে নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে আগ্রহী তারা।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রসঙ্গে টোটা জানান, ২০৩৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি পুরোপুরি অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চান। এরপর অভিনয় পুরোপুরি ছেড়ে না দিলেও পার্টটাইমভাবে কাজ করার ইচ্ছা রয়েছে। বাকি সময় যোগ, ধ্যান ও আধ্যাত্মিক চর্চায় দিতে চান তিনি। বিশেষ করে ধ্যানযোগ, রাজযোগ ও ভক্তিযোগ নিয়ে পড়াশোনা করার পরিকল্পনা রয়েছে তার।












