মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত, গাজা যুদ্ধ এবং সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার কারণে দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যেই সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ইসরায়েলি হামলা তুরস্কের সঙ্গে দেশটির সরাসরি সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে হামলা চালায় ইসরায়েল। তেল আবিবের দাবি, সেখানে তুরস্ক সামরিক তৎপরতা চালাচ্ছিল। তবে সিরিয়াবিষয়ক মার্কিন দূত টম ব্যারাকের বক্তব্য অনুযায়ী, হামলার আগে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে তথ্য দিলেও মার্কিন গোয়েন্দা তদন্তে তুরস্কের সামরিক উপস্থিতির দাবির পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসংঘসহ বিভিন্ন পক্ষ উদ্বেগ প্রকাশ করে।
আঙ্কারা ঘটনাটিকে উসকানি হিসেবে দেখলেও সরাসরি সামরিক উত্তেজনা বাড়ানোর পথে যায়নি। বরং তুরস্ক বিষয়টিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। দুই দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সামরিক যোগাযোগের ব্যবস্থা থাকলেও হামলার আগে তুরস্ককে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মধ্যে নতুন কোনো সংঘাতকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগাতে চাইতে পারেন। সিরিয়া, লেবানন কিংবা গাজা—যেকোনো ফ্রন্টেই উত্তেজনা বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
সিরিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়েও তুরস্ক ও ইসরায়েলের অবস্থান ভিন্ন। তুরস্ক একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও কেন্দ্রীয় সিরীয় সরকারকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। বিপরীতে ইসরায়েল সিরিয়াকে সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে ওঠা থেকে বিরত রাখতে চায়।
এ কারণে সিরিয়াকে ঘিরে ইসরায়েলের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও কয়েকটি আরব দেশের অবস্থানের সঙ্গেও অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিচ্ছিন্নতা ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাবের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতাকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী কোনো জোট না হলেও আঞ্চলিক দেশগুলো যে নিজেদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে সামনে রেখে নতুন সহযোগিতার কাঠামো তৈরি করছে, তা স্পষ্ট।
একসময় যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, আব্রাহাম চুক্তি ছিল তার অন্যতম উদাহরণ। কিন্তু গাজা যুদ্ধ ও ইসরায়েলের সামরিক নীতির কারণে সেই প্রক্রিয়া আগের মতো সহজ নেই।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রকেও নীতিগতভাবে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে তোলার দীর্ঘদিনের মার্কিন কৌশল এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্য ক্রমেই একক শক্তিকেন্দ্রের বদলে বহু-কেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। তুরস্ক, সৌদি আরব, ইরান, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের স্বার্থে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।
সব মিলিয়ে সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা শুধু তেল আবিব ও আঙ্কারার সম্পর্কের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—ইসরায়েল কি আগের মতো আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে পারবে, নাকি নতুন বহুকেন্দ্রিক মধ্যপ্রাচ্যে তুরস্ক ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে?
সূত্র: আলজাজিরায় প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল অর্ডারস প্রোগ্রামের সহ-পরিচালক গালিপ দালের মতামত অবলম্বনে।












