মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত নিরসনে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেননি তিনি। বরং ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়ে তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
বুধবার আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ফেরার জন্য তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। তিনি বলেন, যত দিনই লাগুক না কেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো তাড়াহুড়োর মধ্যে নেই।
ইরানকে আলোচনায় ফেরাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক পদক্ষেপ নাকি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা—কোনটি বেশি কার্যকর মনে করে, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তিনি মনে করেন দুটিই সমানভাবে কার্যকর। একইসঙ্গে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কঠোর মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের দাবি, ইরানে চরম মূল্যস্ফীতি চলছে এবং দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে। পাশাপাশি ইরান সরকার নিজ দেশের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে প্রায় ছয় মাসে পৌঁছাতে যাচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর ট্রাম্প একাধিকবার এই সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি এটি চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তবে বর্তমান বক্তব্যে তিনি সংঘাতের সমাপ্তির কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
এর আগে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ওই সমঝোতার অন্যতম লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখা, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথ তৈরি করা এবং দেশটির পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি করা। তবে চলতি আগস্টের শুরুতে সেই সমঝোতার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
এরপর ইরানকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে ওয়াশিংটন নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। গত সোমবার ইরান এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত বিভিন্ন দেশের ৬০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে ‘অর্থনৈতিক ডি-ডে’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং অভিযানের নাম দিয়েছেন ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’।
নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র বিরোধিতা করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মার্কিন পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তেহরানের দাবি, এটি এখন আর শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; বরং দেশটির সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান ও নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। খোলা বাজারে এক ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়ালেরও বেশি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুদ্ধ শুরুর পর ইরানে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, টমেটোর দাম গড়ে ৭১ শতাংশ, মুরগির মাংসের দাম ৭৪ শতাংশ এবং রান্নার তেলের দাম ১৭৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর।
তবে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশ চীনের বাজারনির্ভর হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা নীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির বড় অংশ চীনে যায়। ফলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। মার্কিন ট্রেজারি কর্মকর্তারাও বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করার বিষয়ে সতর্কতার কথা জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটনভিত্তিক কুইন্সি ইনস্টিটিউটের প্রধান ট্রাইটা পারসির মতে, অর্থনৈতিক সংকট ইরানের জনগণের দুর্ভোগ বাড়াতে পারে; কিন্তু সেই দুর্ভোগকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে রূপান্তর করে তেহরানকে মার্কিন শর্তে চুক্তিতে বাধ্য করা ভিন্ন বিষয়। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ নীতি শেষ পর্যন্ত আলোচনার পথ কতটা উন্মুক্ত করতে পারবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।












