আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। বিদ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও প্রেমের কবি নজরুলের প্রয়াণের পাঁচ দশক পূর্ণ হলো। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদান রাখা এই কবি মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পরও তাঁর সৃষ্টি ও দর্শনের মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়ে গভীরভাবে বেঁচে আছেন।
১৮৯৯ সালের ২৫ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পরবর্তী সময়ে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও নাটকসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তিনি সৃজনশীলতার অনন্য স্বাক্ষর রাখেন।
নজরুলের সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যায়, শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ। তাঁর লেখায় একই সঙ্গে উঠে এসেছে সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাধীনতা ও ভালোবাসার বার্তা। ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আহ্বান ছিল তাঁর সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার শক্তিশালী প্রকাশ ঘটে। কবিতাটি তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর লেখনী হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও জাগরণের অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়।
নজরুল শুধু বিদ্রোহের কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রেম ও মানবতারও কবি। তাঁর অসংখ্য কবিতা ও গান বাঙালির আবেগ, প্রেম, বিরহ ও জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। একইসঙ্গে ইসলামী গান, শ্যামাসংগীত ও বিভিন্ন ধারার সংগীত রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ এক ভাণ্ডার।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ভারত থেকে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। পরে তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হয়।
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
নজরুলের শারীরিক মৃত্যু হলেও তাঁর সৃষ্টি থেমে যায়নি। তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম এখনো অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষকে সোচ্চার হতে অনুপ্রাণিত করে। সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে বার্তা তিনি রেখে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
মৃত্যুর ৫০ বছর পরও বাংলা সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতিতে অমর হয়ে আছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই বিদ্রোহী এই কবির প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জানানো সম্ভব।












