নারায়ণগঞ্জে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে ঘিরে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে। আবাসিক এলাকায় রান্নার গ্যাসের সংকটের পাশাপাশি শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহে ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সমস্যার কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন অনেকেই। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় তুলনামূলকভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক থাকলেও সদর ও বন্দর উপজেলার বেশ কিছু এলাকায় সংকট তীব্র। দিনের বিভিন্ন সময়ে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া, বিদ্যুৎ চলে যাওয়া এবং দীর্ঘ সময় পর সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কারণে দুর্ভোগে পড়ছেন বাসিন্দারা।
গ্যাস বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে স্থানীয় এমপি এডভোকেট আবুল কালাম সরব থাকলেও সমস্যার সমাধান হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্যাস-বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবায় নিয়মিত ভোগান্তির পরও এর স্থায়ী সমাধানে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। জনপ্রতিনিধিরা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। ফলে স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
শুধু আবাসিক গ্রাহক নয়, সংকটের বড় প্রভাব পড়ছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পখাতেও। বিশেষ করে রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহে গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও উৎপাদন কমানো হচ্ছে, আবার কোথাও কারখানা চালু রাখাই কঠিন হয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
শিল্প মালিকদের ভাষ্য, গ্যাসের চাপ কম থাকা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা যাচ্ছে না। সময়মতো পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি করতে না পারলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যবসার ওপর।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু ব্যাবসায়ীদের সাথে নিয়ে সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি কারখানা নতুন করে চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে দিপু ভূঁইয়ার প্রচেষ্টায়।
কারখানা মালিকেরা বলছেন কারখানায় উৎপাদন কমে গেলে বা কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন শ্রমিকরা। কর্মঘণ্টা কমে যাওয়া, উৎপাদন বন্ধ থাকা কিংবা চাকরি হারানোর আশঙ্কায় শ্রমিকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু শিল্প মালিকদের সমস্যা নয়, এর সঙ্গে শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিও জড়িয়ে পড়েছে।
রূপগঞ্জের পাশাপাশি সোনারগাঁ ও আড়াইহাজার উপজেলার শিল্প এলাকাতেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ে উৎপাদন ব্যয়।
সোনারগাঁ ও আড়াইহাজারের বাসিন্দাদের অভিযোগ, শিল্প ও আবাসিক দুই ক্ষেত্রেই গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা হলেও স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় তাদের প্রতিও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের জন্য তিতাস কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছেন নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ নির্বাচন আজহারুল ইসলাম মান্নান। তিতাসের অসৎ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যাবস্থা নেয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
রাজনৈতিকভাবে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে। জাতীয় নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বাইরে স্থানীয় ইস্যু ও নাগরিক সেবা নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক, যানজটসহ দৈনন্দিন সমস্যার সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর ভূমিকা কতটা ছিল ভোটের সময় সেই হিসাবই সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।
বিশেষ করে সদর, বন্দর, রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ ও আড়াইহাজারে শিল্প ও আবাসিক—দুই ধরনের ভোটারই গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের ভুক্তভোগী। শিল্প মালিকদের পাশাপাশি শ্রমিক ও সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে তা নির্বাচনী মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে।
স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, সরকার বা জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আস্থা ধরে রাখতে হলে শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন জনদুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানও স্থিতিশীল থাকবে।
ফলে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এখন কেবল জ্বালানি সরবরাহের সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জনভোগান্তি, শিল্পের উৎপাদন, শ্রমিকের কর্মসংস্থান এবং জনপ্রতিনিধিদের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এসব বিষয় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।












