পশ্চিম আফ্রিকার গিনি-বিসাউয়ের বোয়ে জাতীয় উদ্যানের সাভানা বনাঞ্চলে একটি অদ্ভুত আচরণ নজরে এসেছে। বছরের পর বছর ধরে একই গাছের কাণ্ড লক্ষ্য করে পাথর ছুড়ে চলেছে বুনো শিম্পাঞ্জিরা। শুধু পাথর ছোড়াই নয়, গাছের গোড়ায় জমা হচ্ছে পাথরের স্তূপও।
গবেষকদের ভাষায়, এই আচরণের নাম ‘অ্যাকিউমুলেটিভ স্টোন থ্রোয়িং’। সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু গাছ শিম্পাঞ্জিরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এ কাজে ব্যবহার করছে।
কেন একই গাছে পাথর ছোড়ে?
শিম্পাঞ্জিদের এই অদ্ভুত আচরণের কারণ খুঁজতে ক্যামেরা ও শব্দ ধারণের যন্ত্র বসিয়েছেন গবেষকরা। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পাথর ছোড়ার সময় বিশেষ করে বয়স্ক পুরুষ শিম্পাঞ্জিরা উচ্চস্বরে ‘প্যান্ট হুট’ নামে এক ধরনের ডাক দেয়।
দূরবর্তী শিম্পাঞ্জিদের কাছে বার্তা পৌঁছাতে এই ডাক ব্যবহার করা হয় বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। অনেক সময় পাথর ছোড়ার পাশাপাশি গাছের গোড়ায় হাত-পা দিয়ে জোরে আঘাতও করে তারা। এই আচরণকে বলা হয় ‘বাট্রেস ড্রামিং’।
গবেষকদের ধারণা, পাথর ছোড়া, ডাক ও গাছের গোড়ায় আঘাত করার এই সমন্বিত আচরণ শিম্পাঞ্জিদের সামাজিক যোগাযোগ, শক্তি প্রদর্শন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে এর সঠিক অর্থ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
এটি কি শিম্পাঞ্জিদের ‘সংস্কৃতি’?
গবেষণায় সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, পশ্চিম আফ্রিকার সব শিম্পাঞ্জি দলের মধ্যে এই আচরণ দেখা যায় না। মাত্র চারটি দলের মধ্যে এ ধরনের পাথর ছোড়ার অভ্যাস পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, বিভিন্ন বনাঞ্চলে পাথর ও গাছ থাকলেও সব শিম্পাঞ্জি একই কাজ করে না। এ কারণে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এটি কোনো সাধারণ স্বভাব নয়; বরং নির্দিষ্ট দলের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শেখা এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক আচরণ’ হতে পারে।
২০১৭ সালে শনাক্ত করা পাথর ছোড়ার স্থানগুলোতে সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে গবেষকরা দেখেছেন, বেশির ভাগ জায়গা এখনো শিম্পাঞ্জিরা ব্যবহার করছে। এতে ধারণা আরও জোরালো হয়েছে যে, তারা পুরোনো স্থান ও আচরণ দীর্ঘ সময় ধরে মনে রাখে।
আড়াল থেকে চলছে পর্যবেক্ষণ
বোয়ে জাতীয় উদ্যানের শিম্পাঞ্জিরা মানুষের উপস্থিতি এড়িয়ে চলে। তাই তাদের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। এ কারণে গবেষকরা গাছের আশপাশে ভিডিও ক্যামেরা ও শব্দ ধারণের যন্ত্র বসিয়েছেন।
কোন বয়সের শিম্পাঞ্জি পাথর ছুড়ছে এবং এ ঘটনার পর আশপাশের অন্য শিম্পাঞ্জিরা কী প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে—এসব তথ্য সংগ্রহ করছেন তারা।
শিম্পাঞ্জিরা খাবার সংগ্রহের ক্ষেত্রেও পাথর ব্যবহার করে। শক্ত খোলসের বাদাম ভাঙতে পাথরের ব্যবহার তার একটি উদাহরণ। তবে একই জায়গায় বারবার পাথর ছুড়ে স্তূপ তৈরি করা এবং সেটিকে সামাজিক আচরণের সঙ্গে যুক্ত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয় বলে মনে করছেন গবেষকরা।
মানুষের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ
শিম্পাঞ্জির এই আচরণ শুধু প্রাণীবিজ্ঞানের কৌতূহলের বিষয় নয়। মানুষের সবচেয়ে কাছের জীবিত আত্মীয়দের একটি হওয়ায় শিম্পাঞ্জিদের পাথর ব্যবহার ও যোগাযোগের ধরন পর্যবেক্ষণ করে মানুষের বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কেও ধারণা পাওয়ার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশেষ করে প্রাচীন মানুষের মধ্যে পাথরের ব্যবহার ও জটিল যোগাযোগব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠেছিল, সে বিষয়ে শিম্পাঞ্জিদের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিতে পারে।
খনিজ উত্তোলনে হুমকির মুখে আবাসস্থল
গিনি-বিসাউয়ে বনাঞ্চলের পাশাপাশি বক্সাইট উত্তোলন ও খনিজ অনুসন্ধান বাড়ছে। এর ফলে বন ধ্বংস ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গবেষকদের আশঙ্কা, শিম্পাঞ্জিদের আবাসস্থল ধ্বংস হলে শুধু প্রাণীগুলোই নয়, তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক আচরণের এসব নিদর্শনও হারিয়ে যেতে পারে।
গাছের গোড়ায় পড়ে থাকা পাথরের স্তূপ তাই হয়তো নিছক পাথরের স্তূপ নয়। এর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে শিম্পাঞ্জিদের দীর্ঘদিনের সামাজিক আচরণ ও যোগাযোগের এমন কোনো রহস্য, যার অর্থ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেননি বিজ্ঞানীরা।
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি












