কয়েক সপ্তাহের আপেক্ষিক সামরিক নীরবতার পর আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। হরমুজ প্রণালীতে মাইন স্থাপনের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এক মাসেরও বেশি সময় পর দুই দেশ পরস্পরের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক হামলা চালিয়েছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড—সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চার লক্ষ্য করে মার্কিন বাহিনী সীমিত ও নির্ভুল হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, ইরানি বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে সমুদ্র মাইন স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি নিষ্ক্রিয় করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
তবে ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দর আব্বাসের কাছে বিস্ফোরণের ঘটনায় সামরিক সদস্য ও বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
মার্কিন হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস—আইআরজিসি। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ট্রাম্প প্রশাসনের ‘কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করে এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে।
অন্যদিকে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশটির আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো জনবসতি ও স্থাপনায় আঘাত হানার আগেই প্রতিহত করা হয়।
এদিকে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট হিসেবে পরিচিত এই প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীকে মাইনমুক্ত ঘোষণা করে সতর্ক করেছিলেন, সেখানে আবার মাইন স্থাপনের চেষ্টা করা হলে সংশ্লিষ্ট নৌকা বা জাহাজ ধ্বংস করা হবে।
নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯০ দশমিক ৫৭ ডলারে পৌঁছেছে। একই সময়ে মার্কিন ক্রুডের দাম ২ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৮৫ দশমিক ৬৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা বন্ধ থাকলেও ওমানের মধ্যস্থতায় সমুদ্র যোগাযোগ পুনরায় স্বাভাবিক করার বিষয়ে ইরানের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কাতারসহ কয়েকটি আঞ্চলিক দেশও এ প্রচেষ্টায় সমর্থন দিচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন সামরিক পদক্ষেপের পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের অর্থ লেনদেনে সহায়তাকারী বিভিন্ন দেশের ব্যাংকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
সব মিলিয়ে সামরিক হামলা, পাল্টা হামলা, হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা এবং নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।




