বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলায় তেল রপ্তানি শুরু করার কথা জানিয়েছে রাশিয়া। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাকের দাবি, প্রথম তেলবাহী ট্যাংকারটি ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলীয় ডিকসন বন্দর ছেড়ে গেছে। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
তুরস্কের সংবাদমাধ্যম আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার রাশিয়ার রাজনৈতিক টক শো ‘সলোভিওভ লাইভ’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় নোভাক এসব কথা জানান। তিনি বলেন, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রির ক্ষেত্রে কোনো অচলাবস্থা নেই এবং দেশটির তেল কেনার জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত ক্রেতা রয়েছে।
নোভাকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথম তেলবাহী ট্যাংকারে তেল বোঝাই করে সেটি ডিকসন বন্দর ছেড়ে গেছে। বন্দরটি রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের ক্রাসনোইয়ারস্ক অঞ্চলে কারা সাগরের উপকূলে অবস্থিত। তবে ট্যাংকারটির গন্তব্য, তেলের পরিমাণ এবং কোন দেশের ক্রেতার কাছে চালানটি পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়নি।
রাশিয়ার তেল রপ্তানির এই উদ্যোগ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি পরিবহন করা হয়। এই নৌপথে চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানির দাম প্রভাবিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৯ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের টেলিফোনে আলোচনার পর আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ ডিজেল সরবরাহ নিয়ে একটি সমঝোতার কথা জানানো হয়। রাশিয়ার বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার সম্ভাবনা নিয়ে ইউক্রেনের আপত্তি রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে আয় বাড়লে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হতে পারে।
ফলে রুশ জ্বালানি রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ একদিকে বিশ্ববাজারে সরবরাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করলেও অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
আলেকজান্ডার নোভাকের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ থেকে ৬০ লাখ ব্যারেল তেলের ঘাটতি রয়েছে। তাঁর মতে, সরবরাহের এই ঘাটতি তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা দূর না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ পুনরায় নিশ্চিত করা গেলে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে বাজারে ভারসাম্য ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের জরুরি মজুত ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়ে আসছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
তবে প্রতিদিনের তেলের ঘাটতির পরিমাণ এবং বাজারে ভারসাম্য ফেরার সম্ভাব্য সময়সীমা রুশ উপপ্রধানমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব। এগুলোকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা পূর্বাভাস হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানির বিষয়ে নোভাক জানান, ‘পাওয়ার অব সাইবেরিয়া’ পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে বছরে ৩ হাজার ৯০০ কোটি ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে রাশিয়ার। ভবিষ্যতে এই পরিমাণ ৪ হাজার ৪০০ কোটি ঘনমিটারে উন্নীত করার বিষয়েও চুক্তির কথা উল্লেখ করেন তিনি।
রাশিয়ার জন্য চীনের বাজার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে। চীনে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে পারলে রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইউরোপে গ্যাস সরবরাহের প্রসঙ্গে নোভাক বলেন, নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনের চারটি লাইনের মধ্যে তিনটি বিস্ফোরণ ও অন্তর্ঘাতমূলক ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে একটি লাইন অক্ষত রয়েছে। তাঁর দাবি, ইউরোপীয় ক্রেতারা আগ্রহ দেখালে অবশিষ্ট পাইপলাইন দিয়ে আবার গ্যাস সরবরাহ করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব।
তবে পাইপলাইনটি ব্যবহার করে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় শুরু করতে হলে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের পাশাপাশি রাজনৈতিক, নিয়ন্ত্রক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। রাশিয়ার বক্তব্যের ভিত্তিতে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ শিগগিরই শুরু হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো এই বিবরণে নেই।
সব মিলিয়ে, রাশিয়ার তেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ এবং চীনে গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে দেশটির অবস্থান ধরে রাখার প্রচেষ্টার অংশ। তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কতটা কমবে বা সরবরাহ পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করবে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি, উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।
